মানুষের কথা: ‘ডাল-ভাতই জোডে না, মাছ-মাংস খামু ক্যামনে’
‘রিকশা চালাইয়া দিনে ৪০০ থিকা ৪৫০ টেয়া পাই। রিকশার মালিকরে দেওন লাগে দিনে ২০০ টেয়া। হাতে থাহে ২০০ থিকা ২৫০ টেয়া। মাসে গড়ে রোজগার করি সাড়ে চার হাজার থিকা সাড়ে পাঁচ হাজার টেয়া। বাজারে চাউল, ডাইল, মাছ-মাংসসহ সব জিনিসের দামই চড়া। রোজগারের টেয়ায় পাতে ডাল-ভাতই জোডে না, মাছ–মাংস খামু ক্যামনে? দুধ–ডিম খামু ক্যামনে? টেয়ার লইগা ছয় মাসেও একবার মাংস জোডে না। খাইয়া না–খাইয়া খুব কষ্টে আছি।’
গতকাল শুক্রবার এভাবেই প্রথম আলোর কাছে কষ্টের কথা বলছিলেন রিকশাচালক মো. হুমায়ুন কবির (৬৫)। তিনি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার শোভনকর্দী গ্রামের বাসিন্দা। সাত ভাইবোনের মধ্যে হুমায়ুন চতুর্থ। স্ত্রী, বাবা ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে গ্রামের জীর্ণ দোচালা ঘরে কোনোরকমে মাথা গুঁজে থাকছেন। ৪০ বছর ধরে উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকায় রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে তিনি সংসার চালাচ্ছেন।
বিকেলে উপজেলা সদরের কলেজ রোড এলাকায় রিকশা থামিয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন হুমায়ুন কবির। সেখানে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর জীবনের লড়াই ও কষ্টের কথা।
হুমায়ুন কবির বলেন, তাঁর সম্পদ বলতে একটা ছোট্ট টিনের জীর্ণ দোচালা ঘর। ২০-২২ বছর বয়স থেকে একটানা ৪০ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর নিজের রিকশা নেই; ভাড়া করা রিকশা চালান। প্রতিদিন সকাল আটটায় রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, বাড়িতে ফেরেন রাত ৯টা-১০টায়। ব্যাটারিচালিত রিকশা নয়, তিনি প্যাডেলচালিত রিকশা চালান। পায়ের জোরেই রিকশা টানতে হয়। শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধছে। দুর্বল ও অসুস্থ শরীর নিয়ে রিকশার প্যাডেল ঘোরাচ্ছেন দিন-রাত। প্রতিদিন আয় করেন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। রিকশার মালিককে প্রতিদিন ভাড়া দেন ২০০ টাকা। যা থাকে, তা দিয়ে কোনোরকমে চলে সংসারের খরচ।
খারাপ আবহাওয়াসহ নানা কারণে মাসে ২০-২২ দিন রিকশা চালান হুমায়ুন। তিনি বলেন, ‘মাংসের দাম বেশি। গত কোরবানির ঈদে মাংস খাইছিলাম। আর পারি নাই। ওষুধ কিনা ও কাপড়চোপড় কিনার টেয়া মিলান যায় না। ধার–কর্জ করতে অয়। মাইনষের কাছে আত পাততে লজ্জা লাগে। টেয়ার অভাবে ভাঙা ঘরডাও ঠিক করতে পারতাছি না। বৃষ্টি অইলে ঘরে পানি ঢোয়ে। গতর খাইটা সংসার চালাই, শান্তি এইডাই।’
মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের দিঘলদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মামুন বলেন, তিনি হুমায়ুনকে চেনেন। মাঝেমধ্যে তাঁর রিকশায় যাতায়াত করেন। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি এক টাকাও রাখেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে এই বয়সেও তিনি যেভাবে জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অবশ্যই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।