‘ভাই, আমি মনে হয় বাঁচব না, আমাকে মাফ করে দেন’

সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর। তার আগে এমন দুঃসংবাদ। টেরিবাজারে আগুনে নিহত মুনতাসির সোলাইমানের স্বজনেরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তাঁর মৃত্যুর খবর। আজ বেলা একটায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেছবি: সৌরভ দাশ

তিন মাসের ছোট্ট আয়মানের প্রথম ঈদ। ঈদের দিন তাকে সাদা পাঞ্জাবি পরিয়ে কোলে নিয়ে ছবি তোলার কথা ছিল বাবা মুনতাসির সোলায়মানের। সেই পাঞ্জাবি কেনাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঈদের সেই সকাল আর আসবে না মুনতাসিরের জীবনে। আগুনে ধোঁয়ার ভেতর আটকে গিয়ে থেমে গেছে তাঁর জীবন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের টেরিবাজার এলাকায় বহুতল বিপণিবিতানে আগুন লাগে। আগুনের ধোঁয়ায় গুরুতর আহত দুজনের মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন মুনতাসির সোলায়মান (২৭) ও মোহাম্মদ ইউনুস (৫৫)। আহত মো. মামুন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মুনতাসির সোলায়মান একটি জুতার দোকানের কর্মচারী এবং মোহাম্মদ ইউনুস একটি টেইলার্সের দরজি ছিলেন। তাঁদের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়।

দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামীকাল শুক্রবার অথবা পরশু শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের আগে হঠাৎই মুনতাসির ও ইউনুসের পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। উৎসবের সব আয়োজন ঢেকে গেছে শোকের ছায়ায়।

ঘরে ঘরে যখন ঈদের প্রস্তুতি, ঠিক সেই সময়ই মরিয়ম আক্তার সাথীর কাছে এসে পৌঁছায় স্বামী মুনতাসির সোলায়মানের মৃত্যু সংবাদ। স্বামীর মৃত্যু যেন তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনের দাঁড়িয়ে তিন মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরিয়ম বলছিলেন, ‘ঈদে ছেলের জন্য সাদা পাঞ্জাবি কিনেছিলেন। সকালে বাবা-ছেলে ছবি তুলবে, এ কথা বলছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি তো আর নেই। আমার স্বামী চলে গেছেন। ও আল্লাহ, ওরে কেন নিলেন তাঁকে!’ কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে হাসপাতালের লাশঘরের সামনে মূর্ছা যান তিনি।

আগুনে আটকে পড়েন তাঁরা

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে টেরিবাজারের কে বি অর্কিড প্লাজায় আগুন লাগে। বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় ওয়েস্টার্ন টেইলার্স থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুন লাগার পরপরই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। পরে ফায়ার সার্ভিসের চারটি গাড়ি ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। বেলা পৌনে ১১টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় চট্টগ্রামের এই এলাকার বিপণিবিতান ও দোকানগুলোয় কেনাকাটার জন্য হাজারো মানুষ আসেন। দুপুর থেকে দোকানগুলোয় শত শত মানুষ ভিড় করেন। তবে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় আজ সকালে মানুষের ভিড় ছিল না।

অভিযানে থাকা চট্টগ্রামের নন্দনকানন ফায়ার স্টেশনের পরিদর্শক মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, চারতলার একটি দোকানে আগুন লাগে। পরে আগুনের ধোঁয়া পাঁচতলায় ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচতলা থেকে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। আগুনের কারণে তাঁরা নামতে পারেননি। তাঁরা সেখানে আটকে পড়েছিলেন। আগুনে চতুর্থ তলার সাতটি দোকান পুড়ে গেছে।

টেরিবাজারের বিপণিকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত মোহাম্মদ ইউনুসের স্বজনদের আহাজারি। আজ বেলা একটায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ছবি: সৌরভ দাশ

আগুনে সৃষ্ট ধোঁয়ায় দমবদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মুনতাসির সোলায়মান ও মোহাম্মদ ইউনুসকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আহত অপর ব্যক্তি মো. মামুন চিকিৎসাধীন আছেন। চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির তত্ত্বাবধায়ক নুরুল আলম আশিক প্রথম আলোকে দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নিহত মুনতাসির সোলায়মান পাশের একটি বিপণিবিতানের ম্যানিলা সুজ নামের একটি জুতার দোকানে চাকরি করতেন। সাহ্‌রি খেয়ে ভোরে কে বি অর্কিড প্লাজার ছয়তলার ইবাদতখানায় নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। আগুন লাগার পর নিচে নামতে গিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়েন।

দোকানের স্বত্বাধিকারী ও তাঁর বন্ধু মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘ও আমাকে ফোন দিছিল। বলছিল, ‘‘ভাই, আমি মনে হয় আর বাঁচব না। আমাকে মাফ করে দিয়েন।” এরপর আর কথা হয় না।’ শেষ কথাগুলো এখনো কানে বাজছে তাঁর।

অন্যদিকে, মোহাম্মদ ইউনুস ছিলেন দরজি। কে বি অর্কিড প্লাজার চতুর্থ তলার পাকিজা টেইলার্সে কাজ করতেন তিনি। তাঁর সঙ্গে একই দোকানে কাজ করতেন আহত মামুন। আগুনের সময় তাঁরা পাঁচতলার কারখানায় ছিলেন। ধোঁয়ায় আটকা পড়ে আর বের হতে পারেননি।

ইউনুসের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তিন ছেলে ও এক মেয়ের সংসারে তিনি ছিলেন প্রধান ভরসা। বাবার মরদেহ দেখে বড় ছেলে আরাফাতের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। আহাজারি করতে থাকেন ‘আমার বাপ চলে গেছে, আমার বাপ চলে গেছে...ও বাপ, একবার সাড়া দাও। একটু কথা বলো না বাবা, ও বাবা, একটু কথা বলো না।’