২০২২ সালে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় কৃষি পুরস্কার পান আড়াইহাজারের সরাবদী গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম। হাইজাদী ইউনিয়নের সরাবদী গ্রামটি বিষমুক্ত কৃষির জন্য বিখ্যাত। এ গ্রামের উৎপাদিত সবজি ইউরোপের বাজারে বিক্রি হয়।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ভোটের হালচাল জানতে কথা হয় শফিকুলের সঙ্গে। বাজারে সবজি তুলবেন, তাই টমেটো, কালো বেগুন আর শসা তুলতে ব্যস্ত তিনি। কাকে ভোট দিতে চান—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শফিকুল বলেন, ‘ভোটের আলাপ আমার পোষায় না। শীত শেষ, সামনেই বর্ষা মৌসুম। বর্ষা শুরু হইলে পুরান ব্রহ্মপুত্রের বিষাক্ত পানিতে আমাগো ফসলি জমিন ভাইসা যাইব। জমিন বিষাক্ত হইব। ফসল নষ্ট হইব। গ্রাম মাছশূন্য হইয়া যাইতাছে। ভোটের মাঠে কোনো প্রার্থীই আমাগোর এই সমস্যা নিয়া কথা কয় নাই। আপনিই বলেন, আমরা কাগোরে ভোট দিমু?’
এবার শফিকুলের চোখে আড়াইহাজার এলাকার প্রধান তিনটি সমস্যার কথা জানতে চাইলে তিনি কিছু না ভেবেই উত্তর দেন, ‘প্রধান সমস্যা ডাকাত। তারপরেই দূষণ। এই দূষণ আমরা করি না। আড়াইহাজার, নরসিংদীর ব্যবসায়ীরা কলকারখানার কেমিক্যাল খালে–নদীতে ছাইড়া দেয়। শীতে ওই সব পানি জইমা থাকে। বর্ষায় পানি বাড়তে থাকলে সব কেমিক্যাল আইসা ওঠে আমাগো ফসলি জমিনে। আর মাদকের কথা নতুন কইরা না-ই বলি।’
শফিকুলের এলাকাসহ খাগকান্দা, হাইজাদী ও উচিতপুরা ইউনিয়ন তিনটি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এবার তিনি দলের মনোনয়ন না পেয়ে কলস প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন। তবে এই আসনে কলসের তুলনায় ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রচার বেশি দেখা গেল।
আড়াইহাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে আতাউর ছাড়াও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতের মো. ইলিয়াস মোল্লা (দাঁড়িপাল্লা), কমিউনিস্ট পার্টির মো. হাফিজুল ইসলাম (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. হাবিবুল্লাহ (হাতপাখা), গণ অধিকার পরিষদের কামরুল মিয়া (ট্রাক) ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. আবু হানিফ (হাতি) নির্বাচনের মাঠে আছেন।
প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ভোটারের এই আসনে সাতজন প্রার্থী থাকলেও আড়াইহাজারের ভোটাররা বলছেন, ভোটের মূল লড়াই হবে ধানের শীষের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লা ও কলস প্রতীকের।
শফিকুলের মতো আড়াইহাজারের কৃষকেরা যখন পানি ও মাটিদূষণে ভুগছেন, তখনই মেঘনাপাড়ের বিশনন্দী ফেরিঘাট এলাকার জেলে মাহমুদ হোসেন বলছেন ডাকাত আতঙ্কের কথা। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ফেরিঘাট এলাকায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সেখানে ছিলেন দুই তরুণ। নাম গোপন রাখার শর্তে এক তরুণ বলেন, আড়াইহজারে ডাকাত নতুন কিছু না। আগে রাতে ডাকাতি হতো, এখন দিনদুপুরে ডাকাতি হচ্ছে। কিছুদিন হলো থানা থেকে ৬০ গজ দূরের একটি বাড়িতে দিনে ডাকাতি হয়। পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। মাঘের শেষ হলেও মেঘনা থেকে উঠে আসা হাওয়া হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। ফেরিঘাট ব্যস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা অঞ্চলের যাত্রীদের আনাগোনায়। ‘ভাই চলেন, রাস্তাটা ভালা না।’ বলে দুই তরুণ ফেরিঘাট থেকে গাড়িতে ওঠেন আড়াইহাজার সদরের উদ্দেশে। নানা কথার ফাঁকে দুই তরুণের উদ্দেশে প্রশ্ন করি, সন্ধ্যায় ডাকাতের ভয়? এমন প্রশ্নে তাঁরা হেসে ওঠেন। মো. আকাশ গাড়ির বাইরে হাত বের করে একটি সড়ক দেখিয়ে বলেন, ‘আপনারে এখন ওই রাস্তায় ছেড়ে দিলে কিছুই নিয়া ফিরতে পারবেন না।’
একই ধরনের শঙ্কার কথা জানা গেল আড়াইহাজারের সাতগ্রাম, উচিতপুরা, ব্রাহ্মন্দী, আড়াইহাজার সদর, হাইজাদী, আতাদী এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে। নদীতীরের এই জনপদ দীর্ঘ সময় ধরেই তাঁতশিল্প, কৃষি ও মৎস্যশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এর পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ওপর এই অঞ্চলের বাসিন্দারা নির্ভরশীল। তাঁরা বলছেন, ডাকাতের অত্যাচারে জীবন অতিষ্ঠ। দিনদুপুরেও চুরি–ডাকাতি হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে চাঁদাবাজি বেড়েছে। এবারের নির্বাচনে তাঁরা এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবেন, যাঁরা চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধে কাজ করবেন।
আড়াইহাজার থানার সামনে কথা হয় সরকারি সফর আলী কলেজের শিহাব আহমেদ, মো. ইয়ামিন, আবদুল আহাদের মতো তরুণ ভোটারদের সঙ্গে। তাঁরা প্রথমবারের মতো এবার ভোট দেবেন। জানতে চাই, ভোটের মাঠে কার পাল্লা ভারী। তরুণেরা জানান, ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে কলসও আছে লড়াইয়ের মাঠে।
রোববার আড়াইহাজার বাজার এলাকায় অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের কেউই সরাসরি নাম প্রকাশ করে ভোট নিয়ে নিজেদের মতামত জানাতে রাজি নন। তাঁরা বলছেন, মূল সংকট চাঁদাবাজি। কিন্তু এ কথা বললে বাজারে ব্যবসা করা যাবে না। সন্ধ্যায় গোপালদী এলাকার তাঁত ব্যবসায়ী মো. রাসেল প্রথম আলোকে বলেন, আড়াইহাজার বিএনপি–অধ্যুষিত অঞ্চল। এবার ধানের শীষের প্রার্থী শক্তিশালী। কিন্তু মানুষ এখন আর শক্তি দেখতে চায় না, ভালোবাসা চায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুরো আড়াইহজারজুড়ে চাঁদাবাজি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মানুষ এবার ডাকাতি ও চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা পেতে ভোট দেবেন।