সাগরতীরে জেলেনৌকা ভিড়তেই ‘ডাকুয়াদের’ হাঁকডাক, কেমন ইলিশ পড়ছে এবার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সলিমপুর উপকূলে মৌসুমের শুরুতেই জমে উঠেছে ইলিশের বেচাকেনা। সাগর থেকে নৌকা ভিড়তেই জেলেদের ঘিরে দর হাঁকেন স্থানীয় ‘ডাকুয়ারা’, যাঁরা জেলেদের হয়ে পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করেন। এবার সন্দ্বীপ চ্যানেল ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গত বছরের তুলনায় বেশি এবং আকারে বড় ইলিশ ধরা পড়ছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। এতে তাঁদের লাভও বেড়েছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনেই গত বছরের পুরো জুলাই মাসের চেয়ে বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছে।
বেলা সাড়ে ১১টা তখন। জোয়ার খালে প্রবেশ করেনি বলে সাগর থেকে ইলিশ নিয়ে আসা নৌকাগুলো বেড়িবাঁধ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে উপকূলে ভিড়ছে। সেখান থেকে ছোট ঝুড়িভর্তি ইলিশ কাঁধে করে জেলেরা হেঁটে বেড়িবাঁধে এসে উঠছেন। জেলেরা আসতেই ঘিরে ধরছিলেন পাইকারেরা। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যাচ্ছিল হাঁকডাক। জেলেদের হয়ে মাছের দরদাম করেন যাঁরা, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তাঁরা ‘ডাকুয়া’ নামে পরিচিত। মধ্যস্বত্বভোগী ‘ডাকুয়ারা’ শুরুতেই একটা দর ঠিক করে হাঁকডাক শুরু করেন। এরপর পাইকারদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ দর দিতে পারেন, তাঁকেই দেওয়া হয় ইলিশের ঝুড়ি।
গতকাল শনিবার এমন দৃশ্য দেখা গেল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সলিমপুর সাগর উপকূলে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা মাছের ঝুড়ি নামিয়ে রাখতেই বেড়িবাঁধের ওপর ভিড় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর মধ্যে পাইকাররা তো আছেনই, দু-একজন খুচরা ক্রেতাও রয়েছেন ভিড়ের মধ্যে। মাছ কিনবেন না, কেবল দেখবেন, এমন উৎসুক মানুষের সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যে ডাকুয়াদের কেউ কেউ ‘বড় ইলিশ’, ‘বড় ইলিশ, ও ভাই চাই যন, রাজা ইলিশ ফইজ্যে’ বলে ভিড় আরও বাড়ি দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ বড় ইলিশ অর্থাৎ রাজা ইলিশ ধরা পড়ার খবরে ভিড় ঠেলে জেলেদের ঝুড়ির ওপরই এসে পড়েন। এসবের মধ্যেই দরদাম চলতে থাকে। সব মিলিয়ে সলিমপুর বেড়িবাঁধে যেন উৎসবের আমেজ লাগে।
সলিমপুর বেড়িবাঁধে বেলা সাড়ে ১১ টায় মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেন জেলেরা। একজন দুজন করে ঝুড়ি নিয়ে বেড়িবাঁধে উঠে আসেন তাঁরা। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এভাবে মাছ নিয়ে আসেন জেলেরা। ছোট ইলিশগুলো নিচের দিকে রেখে ওপরের দিকে বড় ইলিশ দিয়ে ঝুড়ি সাজানো হয়। একেকটি টুকরিতে ৭ থেকে ১০ কেজি ইলিশ ধরে। মাছের আকার অনুসারে একেকটি ঝুড়ির মাছ বিক্রি হচ্ছিল পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায়।
সন্দ্বীপ চ্যানেলে ২০টি জালে ১৮ কেজি ইলিশ পেয়েছেন মুন্না জলদাস নামের এক জেলে। বেড়িবাঁধে আনার সঙ্গে সঙ্গে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন সেসব। তাঁর তিনটি ঝুড়িতেই বড় বড় ইলিশ দেখা গেল। একটি ঝুড়িতে দুটি ইলিশ দেখিয়ে বললেন, ‘এই দুটি এক কেজির ওপরে। এ ছাড়া ঝুড়ির অন্তত ১৮টি ইলিশের ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ৮০০ গ্রামের মতো। বাকি ইলিশগুলো আকারে ছোট। প্রতিটির ওজন ২০০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম।’
মুন্না বলেন, যাতায়াত ও শ্রমিকের মজুরি হিসাব করলে তাঁর খরচ হয়েছে দুই হাজার টাকা। এবার এক দিনেই লাভ হলো ১২ হাজার টাকা। এভাবে চললে মৌসুমটা ভালো যাবে। জেলেরা জানিয়েছে, এবার বঙ্গোপসাগরের মোহনা এবং সন্দ্বীপ চ্যানেলে গত বছরের তুলনায় বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। আকারে বড় এবং দাম বেশি হওয়ায় খুশি তাঁরা।
উপজেলা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ১২ জুন থেকে সাগরে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এরপর থেকে মাত্র তিনটি জো (ভরা কটাল) শেষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে।
সলিমপুর বেড়িবাঁধে বেলা সাড়ে ১১টায় মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেন জেলেরা। একজন, দুজন করে ঝুড়ি নিয়ে বেড়িবাঁধে উঠে আসেন তাঁরা। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এভাবে মাছ নিয়ে আসেন জেলেরা। ছোট ইলিশগুলো নিচের দিকে রেখে ওপরের দিকে বড় ইলিশ দিয়ে ঝুড়ি সাজানো হয়। একেকটি টুকরিতে ৭ থেকে ১০ কেজি ইলিশ ধরে। মাছের আকার অনুসারে একেকটি ঝুড়ির মাছ বিক্রি হচ্ছিল পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায়।
মো. রাসেল নামের একজন ডাকুয়া প্রথম আলোকে বলেন, জেলেরা নিজেদের ইলিশ হাঁকডাক করে বিক্রি করতে পারেন না। অনেক সময় পাইকারেরা তাঁদের ঠকান। সে জন্য তারা ডাকুয়াদের ওপর নির্ভর করেন। এতে ঝুড়িপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা পান ডাকুয়ারা।
বেড়িবাঁধে এক ঘণ্টায় কয়েক লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি হয়েছে। পাইকারদের একজন জসিম উদ্দিন জানান, তিনি নিজেই এক লাখ টাকার ইলিশ কিনেছেন। এখন ইলিশের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। এবার ইলিশ গতবারের তুলনায় আকারে বড় হওয়ায় বেশি দামে কিনেও লাভ করতে পারছেন তাঁরা। জসিম উদ্দিন এখানকার সব ইলিশই ঢাকায় পাঠাবেন বলে জানান।
সাগর মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা মাছের ঝুড়ি নামিয়ে রাখতেই বেড়িবাঁধের ওপর ভিড় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর মধ্যে পাইকাররা তো আছেনই, দু-একজন খুচরা ক্রেতাও রয়েছেন ভিড়ের মধ্যে। মাছ কিনবেন না, কেবল দেখবেন, এমন উৎসুক মানুষের সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যে ডাকুয়াদের কেউ কেউ ‘বড় ইলিশ’, ‘বড় ইলিশ, ও ভাই চাই যন, রাজা ইলিশ ফইজ্যে’ বলে ভিড় আরও বাড়ি দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ বড় ইলিশ অর্থাৎ রাজা ইলিশ ধরা পড়ার খবরে ভিড় ঠেলে জেলেদের ঝুড়ির ওপরই এসে পড়েন। এসবের মধ্যেই দরদাম চলতে থাকে। সব মিলিয়ে সলিমপুর বেড়িবাঁধে যেন উৎসবের আমেজ লাগে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার শুধু সলিমপুর এলাকা নয়, উপজেলার ভাটিয়ারী, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া ও বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের জেলেদের জালেও গত বছরের তুলনায় বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে।
জেলেরা জানান, ইলিশের মৌসুমে জো চলাকালে ২৪ ঘণ্টায় চারবার ইলিশ আহরণের জন্য যান জেলেরা। উপকূল থেকে তুলনামূলক কাছে বসানো জালগুলোতে ইলিশের পরিমাণ কম পাওয়া যায়। গভীর সাগরে ইলিশের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। গভীর সাগরে যাতায়াতে তাঁদের খরচও বেশি হয়।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জেলের সর্দার বাদল জলদাস প্রথম আলোকে বলেন, মৌসুমের শুরুতেই বোঝা যায় গোটা মৌসুমে কেমন ইলিশ ধরা পড়তে পারে। গত তিন বছর ধরে জেলেরা মৌসুমের শুরু থেকে খালি হাতে ফিরেছিলেন। এবার সেই তুলনায় অনেক বেশি মাছ ধরা পড়ছে। যদিও ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে; কিন্তু এবার মৌসুমের শুরু থেকে তুলনামূলক বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। আকারও বড়। চাহিদা ও অত্যন্ত বেশি হওয়ায় তাঁরা ভালো দাম পাচ্ছেন। এবার আশা করছেন, গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠবেন তাঁরা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাছিম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের জুন মাসে সীতাকুণ্ডে ১০ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়েছে। এবার তা বেড়ে ১২ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। গত বছর জুলাইয়ের পুরো মাসে ধরা পড়েছে ৭৪ দশমিক ২২ মেট্রিক টন। এবার জুলাই মাসের প্রথম ১৫ দিনে ৭৬ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, তাঁরা এবার জাটকা নিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি করেছেন। সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন। আইন অমান্যকারীদের শাস্তি দিয়েছেন। এ ছাড়া কাউন্সেলিং করেও জেলেদের নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্য করেছেন। ফলে এবার শুরু থেকেই বেশি ইলিশ দেখা যাচ্ছে। এখনো মৌসুমের সিংহভাগ বাকি রয়েছে। মূলত ভাদ্র আশ্বিন মাসে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। চলতি মৌসুমে অন্তত গত পাঁচ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে তার ধারণা।