ভাড়াটে খুনি দিয়ে সাবেক স্ত্রীকে হত্যা করান জামায়াত কর্মী, খুনিকে দিয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা
লক্ষ্মীপুরে সাবেক স্ত্রী সালেহা বেগমকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগে জামায়াতের সাবেক রুকন আবু বক্কর সিদ্দিক আত্মসমর্পণের পর কারাগারে গেছেন। তদন্তে জানা যায়, ৩০ লাখ টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে ৫০ হাজার টাকায় খুনের পরিকল্পনা করেন তিনি। ভাড়াটে খুনি আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
ভাড়াটে খুনিকে দিয়ে সাবেক স্ত্রীকে খুন করানোর অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছে লক্ষ্মীপুরের এক জামায়াত কর্মীকে। আবু বক্কর সিদ্দিক নামের ওই ব্যক্তি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়ন জামায়াতের রুকন ছিলেন। পুলিশ গত বছরের ১৫ জুন সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র দিয়েছিল ওই বছরের ২৮ নভেম্বর। পুলিশের তদন্তে মূল আসামি ও হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে আবু বক্করের নাম উঠে এলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি এত দিন। গত সোমবার ওই মামলায় আত্মসমর্পণ করতে এলে শুনানি শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আমজাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, আসামি আবু বকর ছিদ্দিক নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাদেকুর রহমান তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
যে কারণে খুন
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, জামায়াত কর্মী আবু বকরের আগেও একাধিকবার বিয়ে হয়েছিল। সর্বশেষ সালেহা বেগম নামের এক নারীকে বিয়ে করলেও তা গোপন রেখেছিলেন পরিবারের কাছ থেকে। নিহত সালেহা বেগমেরও আগের স্বামী মারা গেছেন।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জানতে চাইলে মো. কামরুল হাসান বলেন, একসময় আবু বকর কমলনগর উপজেলার পূর্ব চর মার্টিনের বালির পোলে সালেহা বেগমের বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তাঁর ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতেন। সালেহার স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের অজান্তে তাঁকে বিয়ে করেন তিনি। সে সময় আবু বকরের গ্রামের বাড়ি কমলনগরের চর কালকিনিতে স্ত্রী ও পরিবার ছিল।
জানা গেছে, সালেহাকে বিয়ে করে টাকা নিয়ে সে টাকা ফেরত না দিয়ে সটকে পড়েছিলেন আবু বক্কর। স্ত্রীকে তালাকও দিয়েছিলেন। মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, বিয়ের পর স্ত্রী সালেহার কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন আবু বক্কর। এই টাকা দিয়ে জমি কেনার কথা ছিল তাঁর। তবে জমি না কিনে তিনি স্ত্রীর কাছে আরও টাকা দাবি করেন। মূলত ওই টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে। সালেহা টাকার জন্য চাপ দিলে তিনি তাঁকে খুন করার কথা ভাবেন। এ জন্য ৫০ হাজার টাকায় মো. সেলিম নামের একজনকে খুনের প্রস্তাব দেন। চুক্তি অনুযায়ী সেলিম খুন করেন সালেহাকে।
যেভাবে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন
আদালত সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১৬ জুন কমলনগর উপজেলার মতিরহাট–সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীর থেকে সালেহা বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর এক দিন আগে ১৫ জুন সালেহাকে খুন করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর মেয়ে ফাতেমা বেগম অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কমলনগর থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে সেলিম নামের এক ব্যক্তিকে গত বছরের জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দির পর পুলিশ একাধিবার আবু বক্করকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তবে তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর এই মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এতে বলা হয়, আবু বক্করের কথামতো সেলিম কৌশলে সালেহা বেগমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর তাঁকে গলা টিপে হত্যা করেন। হত্যার পর সালেহার কাছে থাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে সাভারে বিক্রি করেন। এক বছর আগের সেই মামলায় আত্মসমর্পণ করে গত সোমবার কারাগারে যান স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিক।
লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এ আর হাফিজ উল্যাহ বলেন, আবু বকর বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কোনো পদে নেই। তবে তিনি অনেক আগে দলটির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।