হাওরে মৃত গাঙ্গেয় শুশুক উদ্ধার, মাছ ভেবে কেটে ভাগ করে নিলেন বাসিন্দারা

হাওরে ডলফিনসদৃশ মৃত প্রাণীটিকে রশি দিয়ে বেঁধে তীরে নিয়ে আসেন স্থানীয় লোকজন। আজ শুক্রবার সকালে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরেছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওর থেকে একটি মৃত গাঙ্গেয় শুশুক উদ্ধার করা হয়েছে। শুশুকটিকে পাওয়া জেলেরা প্রথমে এটিকে বড় মাছ মনে করেছিলেন। পরে ডলফিন বলে ধারণা করে রশি দিয়ে বেঁধে তীরে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রাণীটি কী, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার আগেই সেটি কেটে অন্তত এক শ মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, কেউ কেউ এর মাংস রান্না করে খেয়েছেন।

আজ শুক্রবার সকালে অষ্টগ্রামের ইকুরদিয়া ঘাটের কাছে এ ঘটনা ঘটে। ইকুরদিয়া এলাকার এই হাওরের পানি বর্ষাকালে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশে এক হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রাণীটি কেটে ফেলার আগে তোলা কয়েকটি ছবি সংগ্রহ করে বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপুকে দেখানো হয়। তিনি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন, প্রাণীটি গাঙ্গেয় শুশুক। যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্লাটানিস্তা গ্যাঞ্জেটিকা’ (Platanista gangetica)।

প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে গাঙ্গেয় শুশুক। ডলফিনের মহাবিপন্ন এ প্রজাতি সবচেয়ে বেশি টিকে আছে বাংলাদেশে। তবে নিজ বসতি এলাকা বা নদ-নদীতে বেশ বিপদে রয়েছে এরা। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এ দেশের অধিকাংশ নদীতে গাঙ্গেয় শুশুক দেখা যেত। বর্তমানে দেশের বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা দেশের ১৪টি নদ–নদীতে এ গাঙ্গেয় ডলফিন খুঁজে পেয়েছেন।

ডলফিন ধর পড়েছে এমন খবরে ভিড় জমান স্থানীয় মানুষেরা। আজ শুক্রবার সকালে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরে
ছবি: প্রথম আলো

অষ্টগ্রামের স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পশ্চিম অষ্টগ্রামের রংপুরহাটি গ্রামের কয়েকজন জেলে বৃহস্পতিবার রাতে হাওরে মাছ ধরতে যান। ভোরে মাছ বিক্রি করতে নৌকায় করে তাঁরা পাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর বাজারে যান। মাছ বিক্রি শেষে ফেরার পথে সকাল নয়টার দিকে ইকুরদিয়া ঘাটের কাছে পানির নিচে অস্বাভাবিক বড় একটি প্রাণী দেখতে পান তাঁরা।

গাঙ্গেয় শুশুক সাধারণত সাগর ও নদীর মোহনায় বিচরণ করে। দূষণসহ বিভিন্ন কারণে এটি স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে উজানের দিকে চলে আসতে পারে।

নৌকা থামিয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর জেলেরা প্রাণীটি মৃত বলে বুঝতে পারেন। পরে কয়েকজন পানিতে নেমে রশি দিয়ে সেটি বেঁধে তীরে নিয়ে আসেন।

ডলফিন ধরা পড়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে ওজন করে দেখা যায়, প্রাণীটির ওজন প্রায় আড়াই মণ। প্রাণীটি আসলে কী, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে না পেরে জেলেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। একপর্যায়ে সেটি কেটে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

আরও পড়ুন

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রাণীটি কাটার কাজ শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টায় কাটাকাটি শেষ হয়। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে মাংস ভাগ করে বেলা দুইটার দিকে অন্তত এক শ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

জেলেদের ভাষ্য, প্রাণীটির শরীর ছিল ধূসর ও লম্বাটে। মাথার সামনের অংশ ছিল দীর্ঘ ও সরু। সামনের দিকে চওড়া পাখনার মতো অঙ্গ ছিল। পেছনের অংশেও ডলফিনের মতো বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে।

সুন্দরবন এলাকায় জলকেলিতে মেতেছে ডলফিনটি
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

ওই নৌকায় থাকা রংপুরহাটি গ্রামের নোয়াব মিয়া বলেন, ‘প্রথমে আমি দেখি। নৌকা থামাইতে কই। নাইমা দেখি মরা। পরে সবাই মিলে দড়ি দিয়ে বাইন্ধা তীরে নিয়ে আসি।’ মৎস্য বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে নোয়াব মিয়া বলেন, জানাতে হবে কি না, তা তিনি জানতেন না। তিনি বলেন, ২৩ বছর ধরে মাছ ধরছেন। হাওরে এ ধরনের প্রাণী আগে কখনো দেখেননি। তাই এটি পাওয়ার পর কী করা উচিত, সে বিষয়েও তাঁর ধারণা ছিল না।

প্রাণীটির মাংস খাওয়া যায় কি না, জানতে চাইলে জেলে জুনায়েদ মিয়া বলেন, ‘মাছ মনে কইরা ভাগ কইরা নিয়া গেছে। অনেকে রান্না কইরা খাইয়াও ফালাইছে। এখন খাওয়া যায় কি না, এইডা জাইনা লাভ নাই।’

আরও পড়ুন

প্রাণীটির ছবি কিশোরগঞ্জের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, দেখে মনে হচ্ছে গাঙ্গেয় শুশুক। এটি মাছ নয়, জলজ স্তন্যপায়ী। তিনি জানান, গাঙ্গেয় শুশুক সাধারণত সাগর ও নদীর মোহনায় বিচরণ করে। দূষণসহ বিভিন্ন কারণে এটি স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে উজানের দিকে চলে আসতে পারে। সেখানে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় প্রাণীটির মৃত্যু হতে পারে। আবার নৌযানের যন্ত্রের আঘাতেও এটি মারা যেতে পারে। তবে জেলেরা প্রাণীটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখেননি বলে জানিয়েছেন।

প্রাণীটির মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এটি গাঙ্গেয় শুশুক কি না, সেটিও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা দরকার। তবে প্রাণীটি কেটে ফেলায় এখন সেই সুযোগ নেই।

প্রাণীটির মাংস খাওয়ার বিষয়ে মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, অনেক দেশে গাঙ্গেয় শুশুক খাওয়া হলেও বাংলাদেশে এটি খাওয়ার প্রচলন নেই। এ দেশের মানুষ এটি খাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানে না। ইতিমধ্যে কেউ প্রাণীটির মাংস খেয়ে থাকলে কোনো সমস্যা হতে পারে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খেয়ে যখন ফেলেছে, এখন অপেক্ষা করতে হবে।

আরও পড়ুন