পটুয়াখালীতে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি বুলডোজারে ভাঙচুর, লুটপাটের পর আগুন
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির বসতঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার পর মালামাল লুট করে আগুন দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত এ হামলা চালানো হয়। ওই বাড়ির বাসিন্দাদের অভিযোগ, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ছোট ভাই শাহীন চৌধুরী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মীরা এ ঘটনায় জড়িত।
আওয়ামী লীগের ওই নেতার নাম কাজী মিজানুর রহমান (লাভলু)। তিনি মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মিজানুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন। তাঁর জায়গায় ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িটি উপজেলার কাঁঠালতলী বাজারসংলগ্ন উত্তর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, শনিবার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে ফোন পেয়ে তাঁদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দেখতে পান, কাজী মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন জ্বলছে এবং বাড়ির সামনের অংশ ভাঙা। পরে তাঁরা চারটি কক্ষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
কাজী মিজানুর রহমানের স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী জানান, তাঁর বৃদ্ধা শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় পরিবার নিয়ে তাঁরা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে পলাশ হাওলাদার এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের নেতৃত্বে প্রায় আড়াই শ মানুষ বুলডোজার দিয়ে তাঁদের পাকা বসতঘরটি ভেঙে ফেলেন। তাঁর ভাষ্য, ভবন ভাঙার পর ঘরে থাকা চারটি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), স্বর্ণালংকারসহ পরিবারের ব্যবহার্য প্রায় সব মালামাল লুট করা হয়। লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। এরপর পরে ছয় কক্ষের প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
মেহেরুন্নেছা জানান, এ ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে শনিবার ভোরে বাড়িতে পৌঁছান। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, হামলার আগে কাঁঠালতলী বাজার ও আশপাশের এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। কেউ ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাঁদের কাছ থেকে মুঠোফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ ফুট দূরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ি অবস্থিত। গভীর রাতে বুলডোজারের শব্দ শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীরা তাদের ধাওয়া দিলে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার কারণে সরে যান। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে।
মিজানুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জমি কিনে তিনি বাড়ি করেছেন। কী কারণে তাঁর বাড়ি ভাঙা হয়েছে, এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘যাঁরা আমার বাড়ি ভাঙায় জড়িত, তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই।’
হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী। হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কারা জড়িত—এমন প্রশ্নের জবাবে শাহীন চৌধুরী বলেন, শুক্রবার তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরেছেন, তাই ঘটনার বিষয়ে অবগত নন।
অভিযুক্ত মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি। মনির খন্দকার বলেন, মিজানুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরির জমি দখল করে ঘর তুলেছেন, যা ভূমি অফিসের মাধ্যমে প্রমাণিত, সেখানে তাঁর এক টুকরো জমিও নেই।
প্রশাসনের মাধ্যমে ঘরটি না ভেঙে নিজেরা কেন ভাঙলেন, এমন প্রশ্নে মনির খন্দকার বলেন, ‘বিগত দিনে বিএনপি কিন্তু প্রশাসন ব্যবহার করেননি। তা ছাড়া তাঁরা (মিজানুর রহমান ও তাঁর অনুসারীরা) জবরদখল করছেন। এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বাসায় তিনবার হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। আমরা চাইলে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঘরটি ভাঙতে পারতাম, সেটি না করে পাহারা দিয়েছি।’ এরপর মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।
এ বিষয়ে মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, ভোররাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন দেয় এবং বেকু (খনন) মেশিন দিয়ে বাড়ির অংশ ভেঙে ফেলে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘরের ভেতরে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় এখনো ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, ভোররাতে ফায়ার সার্ভিস থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন। তবে অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। পরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানান ইউএনও।