বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মাদক উদ্ধার বেড়েছে, কারণ কী
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে মাদক পাচার থামছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যেও নিত্যনতুন কৌশলে দেশে ইয়াবা বড়ি ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক নিয়ে আসছে পাচারকারী চক্র।
সীমান্তে নিয়োজিত বাহিনী বিজিবির তথ্য বলছে, চলতি বছরে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে অভিযানে মাঠপর্যায়ের মাদক কারবারিরা ধরা পড়লেও মূল হোতাদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে স্থলসীমান্ত রয়েছে ১৮৭ কিলোমিটার। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, লামা ও থানচির সঙ্গে রয়েছে এই সীমানা। এর বাইরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সঙ্গে মিয়ানমারের জলসীমা রয়েছে ৮৪ কিলোমিটার।
বিজিবি জানায়, ২০২৫ সালে সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৩টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেন, যার আনুমানিক মূল্য ৪৩২ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসেই উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৩টি ইয়াবা বড়ি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে মাদকসহ ৭৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৩৮ জন।
বাংলাদেশের জলসীমা ও উপকূলে প্রায়ই মিয়ানমার থেকে আনা মাদকের চালান ধরা পড়ে কোস্টগার্ডের অভিযানে। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে গত দেড় বছরে ৪৩ লাখের বেশি ইয়াবা বড়ি এবং সোয়া ৫ কেজি ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৯৮ জনকে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আমাদের টহল ও পর্যবেক্ষণ আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি অত্যন্ত তৎপর থাকায় চোরাই পণ্য এখন বেশি ধরা পড়ছে।কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ, সেক্টর কমান্ডার, রামু বিজিবি
চলতি বছরের সবচেয়ে বড় ইয়াবার চালানটি জব্দ করা হয় গত ১১ এপ্রিল। বিজিবির জব্দ করা ওই চালানে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হয়। উদ্ধার হওয়া ইয়াবা বড়ির আনুমানিক বাজার মূল্য ৩১ কোটি ৭৮ লাখ ২০ টাকা। বিজিবি জানায়, ভোরে নাফ নদী সাঁতরে কয়েকজন পাচারকারী টেকনাফের হ্নীলা সীমান্ত দিয়ে চালানটি নিয়ে আসছিল। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁদের শনাক্তের পর অভিযান চালানো হয়।
মাদক উদ্ধার বাড়ার প্রসঙ্গে বিজিবি রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আমাদের টহল ও পর্যবেক্ষণ আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি অত্যন্ত তৎপর থাকায় চোরাই পণ্য এখন বেশি ধরা পড়ছে।’
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনও প্রায় একই কথা জানান। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানোর কারণে পাচারকারীদের রুটগুলো এখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে।
প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের ৮০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী অর্থ সংগ্রহে মাদক পাচারে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া রাখাইনে চাল, ডাল, জ্বালানি তেল ও ওষুধের মতো জরুরি পণ্য অবৈধপথে পাঠিয়ে এর বিনিময়ে মাদক ও অস্ত্র নিয়ে আসছে বাংলাদেশের কিছু চক্র।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে মাদক নিয়ে আসছেন পাচারকারীরা। নিজেদের নিরাপদ রাখতে মাদক পাচারকারীরাও এখন ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে আরাকান আর্মির সহযোগিতায় বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার চলছে। দেশে ইয়াবা এনে হুন্ডির মাধ্যমে এর মূল্য পরিশোধ করা হয়। অনেক সময় মূল্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে চোরাই পথে ওষুধ, খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে আরাকান আর্মির সহযোগিতায় বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার চলছে। দেশে ইয়াবা এনে হুন্ডির মাধ্যমে এর মূল্য পরিশোধ করা হয়। অনেক সময় মূল্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে চোরাই পথে ওষুধ, খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠানো হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, মাদক বিক্রির টাকায় রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করছে। এর মধ্য দিয়ে সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, তাই মাদক চোরাচালান বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সীমান্তসড়কের নির্মাণকাজ চলছে। সেটি সম্পূর্ণ শেষ হলেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার মূল কাজ শুরু হবে, যার মাধ্যমে অপরাধ ও অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে। তিনি বলেন, দুর্গম সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য বর্তমানে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজার ব্যবহার করা হচ্ছে।
মূল হোতারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় মাদক চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিমত সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজারের সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশের। তিনি বলেন, ‘গডফাদাররা সব সময় পর্দার আড়ালে নিরাপদেই থেকে যায়। চুনোপুঁটি গ্রেপ্তার হলেও মূল সিন্ডিকেট অক্ষত থাকায় মাদক ও অস্ত্রের প্রবাহ কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।’
হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরামের কক্সবাজার ইউনিট প্রধান আইনজীবী আবদুল শুক্কুর বলেন, ‘সীমান্তের বেড়া বা ড্রোন শুধু নজরদারি বাড়াতে পারে, কিন্তু মাদক সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা।’
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে টেকনাফে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ১০৩ জন ইয়াবা গডফাদার ও কারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় আইনি ফাঁকফোকরে তাঁরা সবাই খালাস পেয়ে যান। বর্তমানে তাঁদের অনেকেই আবার কারাগার থেকে বা আত্মগোপনে থেকে মাদকের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাদক ও অস্ত্রের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হলে এই আত্মসমর্পণকারী ও চিহ্নিত গডফাদারদের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো দরকার।’