দারিদ্র্য জয় করে বড় হতে চায় ওরা 

দরিদ্র পরিবারে জন্ম ওদের। তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটাতেই যেখানে কষ্ট, সেখানে লেখাপড়ার খরচ আসবে কোথা থেকে। বাধ্য হয়ে নিজেরাই নেমে পড়েছে কাজে। জুগিয়েছে নিজেদের পড়ালেখার খরচ। কেউ নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেছে, কেউ টিউশনি করেছে, কেউ আবার কাজ করেছে ধান কাটার।

এভাবে সংগ্রাম করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার শহীদুল ইসলাম, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার তামিম ইকবাল, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তাসনিম আহম্মেদ, ফরিদপুর শহরতলির মো. ইব্রাহিম ইসলাম। পড়াশোনা করে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখছে ওরা। স্বপ্ন দেখাচ্ছে পরিবারকেও। দারিদ্র্য ডিঙিয়ে সেই স্বপ্ন জয়ই প্রধান চ্যালেঞ্জ ওদের।

নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেছে শহীদুল

বাবা তহুরুল হক রাজমিস্ত্রির সহকারী। মা মানসিক ভারসাম্যহীন। ঋণগ্রস্ত বাবার আয়ে তিন বেলা পেটপুরে খাবার জোটে না প্রতিদিন। খড় ও বাঁশের বেড়ার ঘরের ফাঁকফোকর ঢাকা পলিথিনে। অবস্থা এমন ছিল যে নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই চালাতে না পারলে ছেড়ে দিতে হবে। বাধ্য হয়ে সপ্তম শ্রেণি থেকে নির্মাণশ্রমিক, বীজ রোপণ ও ধান কাটার শ্রমিকের কাজ শুরু করে শহিদুল ইসলাম। এভাবে লেখাপড়া চালিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে সে।

শহীদুল ইসলামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার খোসালপাড়ায়। সে এ বছর গোমস্তাপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অশোক কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, কত যে কষ্ট করে লেখাপড়াটা করেছে শহীদুল, তা বলার নয়। সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষায়ও ভালো করবে। সে যেন লেখাপড়া থেকে ছিটকে না পড়ে, সে জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার।

হাল ছাড়েনি তামিম

দুই ভাই ও বাবা-মা নিয়ে তামিম ইকবালের পরিবার। বাবা মশিয়ার রহমান দিনমজুর। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। পড়ালেখা করানোর ইচ্ছা থাকলেও খরচ দিতে পারছিল না পরিবার। বাধ্য হয় ছোটবেলা থেকে কখনো দিনমজুর, কখনোবা রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ করেছে তামিম। হাল ছাড়েনি। এভাবে সংগ্রাম করে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তামিম ইকবালের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের দোহাজারী গ্রামে। তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সে। তামিমের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্য তাতে বাধার দেয়াল হয়ে আছে। তার মা লাকী বেগম বলেন, ‘ছাওয়াটা ভালো রেজাল্ট করছে। ওর ইচ্ছা ভালো কলেজোত ভর্তি হইবে। কলেজ পাস করি ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু হামার তো নুন আন্তে পান্তা ফুরায়। এত দিন ছাওয়াটা মাইনষের বাড়িত কাম করি নিজে লেখাপড়া খরচ চালাইছে। এ্যালা ওর কলেজোত ভর্তি টাকা কোনঠে পামো, পড়ার খরচ কেমন করি দিমো।’

টিউশনিই ভরসা ছিল তাসনিমের

তাসনিম আহম্মেদের বাবা মো. হেমায়েত উদ্দিন অসুস্থ। কাজকর্ম করতে পারেন না। মা টিউশনি করে কোনোমতে সংসার চালান। তবে মায়ের আয়ে পড়াশোনার খরচ হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে টিউশনিতে নামে তাসনিমও। এভাবে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। 

তাসনিমের বাসা পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নতুন বাজার এলাকায়। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তি পেয়েছে। কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার অংশ নেয় তাসনিম। সংগ্রামী এই কিশোরের মা ফারহানা হক বলেন, ‘আমার ছেলে কষ্ট করে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে। এতে খুশি হয়েছি ঠিকই, তবে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে। সামনে পড়ার খরচ কীভাবে মিটবে, তা ভেবে পাচ্ছি না।’ খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, তাসনিম অসম্ভব মেধাবী ছাত্র। উপজেলায় সে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়তা পেলে ভবিষ্যতেও ভালো করবে।

এতিমখানায় থেকে পড়েছে ইব্রাহিম

চার বছর বয়স পর্যন্ত মা–বাবার সঙ্গে ফরিদপুর শহরতলির ভাজনডাঙ্গা মহল্লায় থেকেছে মো. ইব্রাহিম ইসলাম (১৫)। এরপর রিকশাচালক বাবা মো. কামাল ও মা সীমা বেগম আলাদা থাকতে শুরু করেন। পরে বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাঁদের। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ফরিদপুর শহরের কমলাপুর লালের মোড় এলাকায় একটি পরিবারে আশ্রিত হিসেবে থাকতে শুরু করেন সীমা। ছেলের মুখের দিয়ে তাকিয়ে আর বিয়ে করেননি। 

ছেলেকে মানুষ করতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ নেন সীমা বেগম। সংসারে অভাব থাকায় ২০১৭ সালে ইব্রাহিমকে ফরিদপুর মুসলিম মিশন দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। মুসলিম মিশন এতিমখানায় থেকে পড়ালেখা করে সে।

ইব্রাহিম চলতি বছর দাখিল পরীক্ষায় (এসএসসি সমমানের) ফরিদপুর মুসলিম মিশন দাখিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল সে। মুসলিম মিশন দাখিল মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. ওয়েস কারনী বলেন, ইব্রাহিম অত্যন্ত মেধাবী। একটু সহযোগিতা পেলে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে। 

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জফরিদপুর এবং প্রতিনিধি, তারাগঞ্জ, রংপুরকলাপাড়া, পটুয়াখালী]