‘তেলসংকটে ১২ বছর পর মোটরসাইকেল ছেড়ে আবার বাইসাইকেল ধরলাম’

মোটরসাইকেল রেখে বাইসাইকেল কিনে চালাচ্ছেন জহিরুল ইসলাম। গতকাল সোমবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

‘তেলসংকটে ১২ বছর পর মোটরসাইকেল ছেড়ে আবার বাইসাইকেল ধরলাম। তেলের জন্য যে হাহাকার দেখছি, তাতে মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে ৮-৯ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরলাম।’

গতকাল সোমবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তায় একটি নতুন বাইসাইকেল কিনতে এসে কথাগুলো বলছিলেন জহিরুল ইসলাম। তিনি গাজীপুর সদরের তালতলী গ্রামের একজন মুদিদোকানি। দীর্ঘ এক যুগ পর তাঁর যাতায়াতের সঙ্গী হিসেবে মোটরবাইকের জায়গা নিয়েছে দুই চাকার সাধারণ বাইসাইকেল।

জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পরিচিত অনেকেই ৮-৯ ঘণ্টা ধরে পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল পায় না। পেলেও ২ থেকে ৪ লিটার। এভাবে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। তেলের জন্য আশপাশে হাহাকার দেখছি। আমার বাইকে এখনো ২ লিটারের মতো তেল আছে। এটুকু শেষ হলে আর তেল পাওয়ার আশা নেই। এখন থেকে আশপাশে মোটরসাইকেলে করে যে জায়গায় যাইতাম, সেখানে বাইসাইকেলে যাব। অটোরিকশায় চলাচল করতে আমার ভয় লাগে। বাধ্য হয়ে বাইসাইকেল কিনছি। তা ছাড়া শরীরের ব্যায়ামও হবে। এসব চিন্তা থেকে এটা করা।’ তিনি জানান, তাঁর প্রতিবেশী আনোয়ার শেখ একজন চাকরিজীবী। তিনিও সম্প্রতি মোটরসাইকেল ছেড়ে বাইসাইকেল কিনেছেন।

মাওনা চৌরাস্তার দক্ষিণ দিকে মোহা সিএনজি পাম্পের পাশে কথা হয় একটি পোশাক কারখানার কর্মী মো. ফারুক হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর বাড়ি থেকে অফিসের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। এই দূরত্বের জন্য তিনি ৭ বছর আগে মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। কিন্তু এখন তেলের সংকট হওয়ায় তা ব্যবহার করতে পারছেন না। ৬ এপ্রিল মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকার অকটেন নিয়েছিলেন। এরপর প্রায় ২০ দিন ধরে কোথাও থেকে তেল সংগ্রহ করতে পারেননি। পেট্রলপাম্পে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হলে তাঁর অফিসে যাওয়া হবে না। বাধ্য হয়ে সম্প্রতি তিনি একটি সাধারণ বাইসাইকেল কিনেছেন। এখন অফিসে যাতায়াতে সময় ব্যয় হলেও টাকা বেঁচে যাচ্ছে।

গতকাল মাওনা চৌরাস্তায় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানিসংকট আর পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পাওয়ার ভোগান্তি মানুষের যাতায়াত অভ্যাস বদলে দিচ্ছে। এ পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি এসেছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে। অনেকে মোটরসাইকেল চালানো আগের চেয়ে কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই আবার মোটরসাইকেল রেখে সাধারণ যানবাহনে চলাচল শুরু করেছেন। কেউ কেউ আবার বাইকের পাশাপাশি বাইসাইকেলও কিনেছেন।

মাওনা চৌরাস্তা এলাকার বাইসাইকেলের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে সাইকেল বিক্রির হার বেড়েছে ৫ গুণের বেশি। ওই এলাকার সাদিয়া সাইকেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী শফিক রানা প্রথম আলোকে বলেন, আগে যেখানে মাসে ১০ থেকে ১২টি সাধারণ সাইকেল বিক্রি হতো, এখন সেখানে গত প্রায় এক মাসে ৫০ থেকে ৬০টি বিক্রি হয়েছে। সাধারণ সাইকেলের (ট্রেডিশনাল) পাশাপাশি ছোট-বড় সব ধরনের সাইকেলের চাহিদাই বেড়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের অভাবেই মানুষ আবার সাইকেলমুখী হচ্ছেন। তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে থাকা আকিজ, মেঘনা ও দুরন্ত—এই তিন ব্র্যান্ডের সাইকেলের দিকেই ক্রেতাদের ঝোঁক বেশি।

স্থানীয় অপর বাইসাইকেল ব্যবসায়ী মো. লাভলু প্রথম আলোকে বলেন, এক দশক আগেও প্রতিটি ঘরে বাইসাইকেল ছিল। অনেকের জন্য তা ছিল আভিজাত্য ও প্রয়োজনের। বর্তমান জ্বালানিসংকটে সেই পুরোনো দিনগুলোর দিকে মানুষ ঝুঁকতে শুরু করেছে।

এ বিষয়ে রিভার অ্যান্ড নেচার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সমাজকর্মী খোরশেদ আলম বলেন, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তেলবিহীন যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে যেমন ব্যক্তিগত খরচ কমে, তেমনি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে।