‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে’—যে কথা নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশকে

২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কক্সবাজারের টেকনাফে একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনা র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ারের’ গল্পগুলোর মুখে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁটে দিয়েছিল। সাত বছর পর একরামুল হকের স্ত্রী মামলা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এখন বিচারের অপেক্ষায় পরিবারটি।

নিহত একরামুল হকছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে...’ এরপর আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার টানার শব্দ, পরপর দুটি গুলির আওয়াজ, সেই সঙ্গে মরণাপন্ন কারও আর্তনাদ। মুঠোফোনের অন্য প্রান্ত থেকে তা শুনে মা-মেয়ের উৎকণ্ঠিত হাহাকার।

কক্সবাজারের টেকনাফের একরামুল হকের মুঠোফোনে তাঁর মেয়ে ও স্ত্রী ফোন করার পর রিসিভ হলে অডিওতে রেকর্ড হয়েছিল একরামুল হকের জীবনের শেষ মুহূর্ত। এই অডিও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শোরগোল ওঠে। র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ারের’ গল্পগুলো পড়ে প্রশ্নের মুখে।

তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ২০১৮ সালের ৪ মে দেশজুড়ে ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে শুরু হয়েছিল মাদকবিরোধী অভিযান। ওই বছরের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন একরামুল হক।

আরও পড়ুন

একরাম নিজেও আওয়ামী লীগে যুক্ত ছিলেন। টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। ১২ বছর ছিলেন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।

ঘটনার সাত বছর পর গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম। এটি এখনো তদন্তাধীন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার হবে, সেই আশায় আছেন এখন স্ত্রী, সন্তানেরা।

একরামের মেয়ে তাহিয়াত হক সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবাকে গুলি করে মারার শব্দ এখনো কানে ভাসছে। ভুলতে পারছি না। অন্তত বিচারটা হলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম।’

বাবাকে গুলি করে মারার শব্দ এখনো কানে ভাসছে। ভুলতে পারছি না। অন্তত বিচারটা হলে কিছুটা স্বস্তি পেতাম।
তাহিয়াত হক, একরামুল হকের মেয়ে

শেষ কথোপকথন

হত্যাকাণ্ড ঘটার সময় মেয়ে ও স্ত্রীর সঙ্গে একরামুল হকের কথোপকথন শোনা যায় ফোনে থেকে যাওয়া রেকর্ডে। একরামের প্যান্টের পকেটে থাকা মুঠোফোনে কল করা হলে চাপ পড়ে রিসিভ হয়ে যায়। ফলে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগমের মুঠোফোনে রেকর্ড হয়ে যায় গুলির শব্দ, শোরগোল।

একরাম যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন, তার পাঁচ দিন পর আয়েশা কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলন করে একরামের সঙ্গে তাঁর ও মেয়েদের শেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন।

আয়েশা সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার ক্রমাগত ফোন পেয়ে ২৬ মে (২০১৮ সাল) রাত ৯টার দিকে একরাম বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। রাত ১১টার সময়ও বাড়ি ফিরে না এলে তাঁর মেয়ে ১১টা ১৩ মিনিটে ফোন করেন তাঁর বাবাকে।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ থানার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় নিহত হন একরামুল হক। তখন র‍্যাব দাবি করেছিল, মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গোলাগুলিতে নিহত হন ‘ইয়াবা গডফাদার’ একরামুল হক। তবে একরামুলের স্ত্রী তখনই বলেছিলেন, তাঁর স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত নন।

অডিওতে শোনা যায়, মেয়ে জানতে চাইছে তিনি কোথায় আছেন। জবাবে একরাম বলেন, ‘মেজর সাহেব’ ডেকেছিলেন, ওখান থেকে তিনি টিএনও (ইউএনও) অফিসে যাচ্ছেন। ফিরতে দেরি হবে কি না—মেয়ের সেই জিজ্ঞাসায় তিনি বলেন, দেরি হবে না। এরপর কলটি কেটে যায়।

রাত ১১টা ১৪ মিনিটে একরামের মেয়ে আবারও ফোন করে জানতে চায়, তিনি কোথায় আছেন? অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, ‘আমি টিএনও (ইউএনও) অফিসে যাচ্ছি তো, আমি চলে আসব আম্মা।’ ফিরতে কতক্ষণ সময় লাগবে—মেয়ের এ জিজ্ঞাসায় অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, ‘বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি চলে আসব ইনশা আল্লাহ, ঠিকাছে? ঘুমাও।’

রাত ১১টা ৩২ মিনিটে মেয়ে আবার ফোন করলে একরাম জানান, হ্নীলায় যাচ্ছেন তিনি।

কেন সেখানে যেতে হচ্ছে, জানতে চাইলে উত্তর আসে, তিনি ‘জরুরি কাজে’ যাচ্ছেন।

মেয়ে তাঁর কাছে আবারও জানতে চায়, কেন?

ধরা গলায় জবাব আসে, ‘যাচ্ছি আম্মু, ঠিকাছে…যেতে হচ্ছে…’

আরও পড়ুন

মেয়ে তখন জানতে চায়, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে...’ এ অবস্থায় ফোন নেন স্ত্রী আয়েশা। তিনি হ্যালো হ্যালো করতে করতেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

রাত ১১টা ৫৪ মিনিটে আবার ফোন করেন একরামের স্ত্রী। ফোন রিসিভ হওয়ার আগে তিনি প্রার্থনা করতে থাকেন যেন একবার স্বামীর সঙ্গে কথা হয়।

গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগম। মামলায় আসামি করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ জনকে। মামলার তদন্ত চলছে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

ফোন রিসিভ হলে আয়েশা বলেন, ‘হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো কে? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো আমি কমিশনারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। হ্যালো কে ওইটা, ফোন রিসিভ করছে ওইটা কে? আমি ওনার মিসেস বলতেছি, হ্যালো, হ্যালো…।’

এমন সময় ফোনের অপর পাশে কাউকে বলতে শোনা যায়, ‘… তুমি যেটা বলছ,… জড়িত না?’ কেউ একজন বলেন, ‘নাহ্‌।’ এরপর আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার টানার এবং দুটি গুলির শব্দ শোনা যায়। সেই সঙ্গে মরণাপন্ন কারও চিৎকার। ওই আওয়াজে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন একরামের স্ত্রী ও মেয়েরা।

আয়েশা বলেন, ‘ও আল্লাহ, আমার জামাই কিছু করে নাই। আমার জামাই কিছু করে নাই। আমরা বিনা দোষী। আমার জামাই, আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই, আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই।’

এ সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কয়েকজনের কথার আওয়াজ শোনা গেলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। শোনা যাচ্ছিল বাঁশির হুইসেল। পরে গালিগালাজের আওয়াজও শোনা যায়।

একপর্যায়ে একরামের স্ত্রী চিৎকার করে জানতে চান, ‘আপনারা কোথায়, আপনারা কোথায়…’

অপর প্রান্তে বাঁশির শব্দ বাড়তে থাকে, গালিও।

কাঁদতে কাঁদতে আয়েশা বলতে থাকেন, ‘আমার জামাই কিছু করে নাই। কমিশনার কিছু করে নাই। আপনারা শুয়ারের বাচ্চা কেন বলতেছেন? উনি কিছু করে নাই। আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই, কমিশনার কিছু করে নাই, ওনাকে কেন মারতাছেন? আপনারা ওনাকে কেন মারতাছেন?’

অন্য প্রান্ত থেকে কয়েকজনের কণ্ঠ শোনা গেলেও তাঁদের কথা বোঝা যাচ্ছিল না। কিছু একটা খুঁজে বের করতে কেউ নির্দেশ দেন। এরপর একজন বলেন, ‘বাড়ি কই, বাড়ি?’ এরপর গাড়ির সাইরেনের শব্দ শোনা যায়।

পরে আরও তিনটি গুলির শব্দ শোনা যায়, সঙ্গে গালাগালি। ফোনের এ প্রান্ত থেকে আয়েশা বলতে থাকেন, তাঁর স্বামী কিছু করেননি, কেন তাঁকে মারা হচ্ছে।

একপর্যায়ে ‘খোসাগুলো’ খোঁজার কথা বলা হয় ফোনের অন্য প্রান্তে। পরে থেমে থেমে বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। একজন বলেন, ‘আর লাগবে না, খোসাগুলো দেখ।’

একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই অডিও মামলার সঙ্গে দিয়েছেন, যা তদন্তে কাজে আসবে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যাবে।

ঘরের দেয়ালে বাবার জন্য একরামুল হকের মেয়েদের লেখা। ২০২২ সালে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

দেয়ালে লেখা প্রশ্নের উত্তর পায়নি দুই মেয়ে

টেকনাফ পৌরসভার পানির ফোয়ারার পূর্ব দিকে লামার বাজার সড়ক দিয়ে ১০০ গজ এগোলেই বাঁ পাশে প্রায় জরাজীর্ণ একটি দোতলা বাড়ি। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভাঙাচোরা দরজা, জানালার কাচ ভাঙা। দেয়ালের রং বিবর্ণ। এই বাড়ির দোতলায় থাকতেন নিহত একরাম তাঁর পরিবার নিয়ে।

একরাম হত্যার চার বছর পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রতিবেদক বাড়িটির দোতলার বসার ঘরে দেখেছিলেন, চার দেয়ালে মার্কার কলমে লেখা, ‘মানুষ মানুষকে গুলি করে মারে।’ ‘নির্দোষ মানুষ কেন মরে?’ ‘ভূতকে ভয় লাগে না, মানুষকে ভয় লাগে।’ ‘আব্বু তুমি কোথায়?’ ‘তুমি কি আর জীবিত ফিরে আসবা না।’ ‘আমাদের আব্বু হত্যার কি কোনো বিচার পাব না?’ ‘আব্বু তুমি কেন নাই।’ ‘আব্বু তুমি কখন আসবা। প্লিজ চলে আসো।’

আরও পড়ুন

কথাগুলো লিখেছিলেন একরামের মেয়ে তাহিয়াত হক ও নাহিয়ান হক। এখন তাঁরা দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন।

তাহিয়াত হক প্রথম আলোকে বলেন, দেয়ালে লেখাগুলোর একটির উত্তর এখনো পাননি। বাবা আর ফিরে আসেননি। বিচারও হয়নি।

একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, টেকনাফে গ্রামের বাড়িতে তাঁরা তেমন যান না। খুব সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হয়। আট বছর আগে দেয়ালে মেয়েদের লেখাগুলো মুছে যাচ্ছে। সংস্কার করতে না পারায় বাসাটি আরও জরাজীর্ণ হয়ে আছে।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘হত্যার বিচার কি হবে না? মেয়েদের কিছু বলতে পারি না।’

ভয়ে ৭ বছর পর মামলা

নিহত একরামের পরিবার ভয়ে মামলা করেনি সাত বছর। রাষ্ট্রক্ষমতায় পালাবদলের পর গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন আয়েশা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে জানান, মামলায় ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

আয়েশা অভিযোগ করেন, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ ইন্ধনে র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা তাঁর স্বামীকে ডেকে নিয়ে খুন করেছেন।

মামলার তদন্ত চলছে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে। এরপর এ ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে গত বছরের ২৫ জুলাই ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

টেকনাফের বাসায় একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম, দুই মেয়ে নাহিয়ান হক ও তাহিয়াত হক। ২০২২ সালে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

মামলায় গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে জানিয়ে আয়েশা বেগম বলেন, ‘শুনেছি, তাঁদের দুজন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁদের যাতে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’

একরামের পরিবার ভয়ে টেকনাফে থাকে না। দুই মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন আয়েশা।

একরামের স্বজনেরা জানান, একরাম তাঁর বাবার রেখে যাওয়া টেকনাফ সদরে ৪০ বছরের পুরোনো বাড়ির এক কক্ষে থাকতেন। ধারদেনা করে পৈতৃক ভিটায় বাড়ি তোলার কাজ শুরু করেছিলেন, শেষ করতে পারেননি। একটি গোয়েন্দা সংস্থার চাপে সেদিন সন্ধ্যায় যখন বের হন, তখন মোটরসাইকেলে তেল ভরার মতো টাকা ছিল না। বাসার উল্টো দিকের একটি হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়েছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে টেকনাফে গুজব ছড়িয়েছিল, একরামুল ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। ঘটনার দিন একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন অনবরত একরামুলকে বিরক্ত করছিলেন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ রেখে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আমার স্বামী মাদক ব্যবসায়ী নন। তালিকায়ও নাম নেই। টাকাপয়সাও নেই। তাহলে ইয়াবা ব্যবসায়ী হলেন কী করে?’

আয়েশা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর র‍্যাব বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল, সেখানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির বাবার নাম-ঠিকানার সঙ্গে তাঁর স্বামীর বাবার নাম-ঠিকানার মিল নেই।

ঘটনার পর গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে র‍্যাব লিখেছিল, ২৬ মে দিবাগত রাত ১টা ৫ মিনিটে র‍্যাব-৭-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অভিযান পরিচালনার সময় গোলাগুলিতে যিনি নিহত হন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও ইয়াবা গডফাদার টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. একরামুল হক কমিশনার (৪৬), পিতা মোজাহার মিয়া ওরফে আবদুস সাত্তার, নাজিরপাড়া, টেকনাফ পৌরসভা, টেকনাফ, কক্সবাজার।

আয়েশা বলেন, একরামুলের বাবার নাম মোজাহার মিয়া নয়, তাঁর ঠিকানাও নাজিরপাড়া নয়। নাজিরপাড়া পৌরসভার বাইরে, সদর ইউনিয়নের একটি গ্রাম।

সরাসরি কেউ হুমকি দেয়নি। তবে নানা কথা শুনি, যার কারণে মেয়েদের নিয়ে শঙ্কায় থাকি।
আয়েশা বেগম, একরামুল হকের স্ত্রী

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ৭৩ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় ১৮ নম্বরে নাম আছে এনামুল হকের, তাঁর বাড়ি নাজিরপাড়া, বাবার নাম মোজাহার মিয়া। এই এনামুল হকই প্রথম ২০১৮ সালের নভেম্বরে নিজেকে নিরপরাধ ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে ফিরতে চাই নিরাপদ জীবনে।’ পরে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।

বন্দুকযুদ্ধের পর টেকনাফ থানায় যে মামলা হয়, তাতে বলা হয়, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে একরাম মারা যান। ২০১৯ সালের ২৫ মে টেকনাফ থানার পুলিশ প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, তদন্তে ঘটনার প্রমাণ না মেলায় মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

একরামের পরিবার মামলা না করলেও বিভিন্ন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। জানতে চাইলে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, কোনো কমিটির তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যাবতীয় কাগজপত্রসহ তাঁকে ডাকার কথা ছিল, আর ডাকা হয়নি।

দুই মেয়েকে নিয়ে এখন চট্টগ্রাম শহরে কষ্টে দিন পার করছেন আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, এক ব্যক্তির সহায়তায় মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। একদিকে আর্থিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ভয়।

কেউ হুমকি দিয়েছে কি না, প্রশ্নে আয়েশা বেগম বলেন, ‘সরাসরি কেউ হুমকি দেয়নি। তবে নানা কথা শুনি, যার কারণে মেয়েদের নিয়ে শঙ্কায় থাকি।’