সৈকত শেখরেশ্বর কলকাতায় থাকেন। তিনি সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (ফিল্ম এডিটিং)। ৪৩ বছর বয়সী এই ‘রাজপুত্র’ একজন সংগীতশিল্পীও।

২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর প্রথমে আলোতে ‘দুর্গাপূজার উৎসভূমি ও রাজা কংসের স্মৃতি’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদকের সেই লেখাটি সৈকতের নজরে আনেন তাঁরই বন্ধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন। যার নির্মিত সব ছবির সম্পাদনার কাজ করেছেন সৈকত। লেখাটি পড়ে তিনি বাপ-দাদার ফেলে যাওয়া রাজপ্রাসাদ দেখতে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ হন। ২৬ জুলাই সাইমন তাঁকে সঙ্গে করে তাহেরপুরে নিয়ে আসেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন উদীচীর ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আরিফ নূর। খবর পেয়ে রাজশাহী থেকে উদীচীর কর্মীরাও দেখাতে করতে যান।

রাজা কংসনারায়ণের মূল রাজপ্রাসাদ ছিল বারোনই নদের পূর্বতীরে রামরামা গ্রামে। সেখানে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা ছিল কংসের প্রাসাদ। সেখানেই ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজা কংসনারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করেন। কংসনারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ্ সুজা সেই প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে যান। পরে অবশ্য লক্ষ্মী নারায়ণ আওরঙ্গজেবের অনুকম্পায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি পরগনা লাভ করেন। সেখানেই তিনি রাজবাড়ি নির্মাণ করে রাজত্ব করেন।

বারোনই নদীর পশ্চিম তীরের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য অটোরিকশায় চেপে রওনা হলেন সৈকত শেখরেশ্বর। গ্রামের ভেতরে রাস্তাঘাট ভালো নয়। প্রাসাদের ভাঙা ইট সর্বত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। ঠিকমতো রিকশাও যেতে পারে না। নিজের রাজবংশের নির্মিত মন্দির দেখে খুশি হলেন সৈকত। কিন্তু সংরক্ষণের উদ্যোগ না দেখে আহত হলেন। বার বার বললেন, এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। অনেক ছবি তুললেন। টেরাকোটা আর ছোট ছোট ইট ছুঁয়ে দেখলেন।

অনুভূতির কথা জানতে চাইলে সৈকত বলেন, ‘ঠাকুমার মুখে অনেক গল্প শুনেছি। সব মিলে যাচ্ছে। আমার ঠাকুরদা শেষ পর্যন্ত তাহিরপুরে ফেরার আশায় ছিলেন। জায়গাজমি যাতে বেহাত না হয়ে যায়, সে জন্য ১৯৬৭ সালের দিকে তিনি দেড় লাখ টাকা ট্যাক্স পাঠিয়েছিলেন। ওদিকে সদ্য গিয়ে কলকাতায় সংসার ঠিকমতো দাঁড় করতে পারেনি।

এরই মধ্যে এতগুলো টাকা দিয়ে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান।’ সৈকত জানান, এরই মধ্যে তাহিরপুর থেকে একজন রাজকর্মচারী একটি চিঠি লিখলেন। ‘রাজা মহাশয় আর বোধ হয় দেশে ফেরা যাবে না।’ সেই সময় দেড় লাখ টাকায় কলকাতায় অনেক কিছুই করা যেত। কিন্তু কিছুই হলো না। সেই আঘাত সইতে না পেরে ১৯৭৪ সালে ঠাকুর দাদা শশাঙ্ক শেখরেশ্বর মারা গেলেন। এ ব্যাথাটাই খুব করে বাজে।

তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজ এসে মনে হলো, ‘রাজপুত্র’ অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। দোতলার কড়িবর্গার সেই ছাদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলেন। বিশাল বিশাল পিলার। মাঝখানে সেই রাজরাজড়াদের বাড়ির বিশেষ নকশার জানালা। তিনি এবার পিলারে হাত দিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখেন, একবার জানালা ছুঁয়ে দেখেন।

তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের পতাকা স্ট্যান্ডের কাছে রাখা আছে রাজার কামান। সৈকত শেখরেশ্বর কামানের পাশে বসলেন। কামানটার ওপরে হাত রাখলেন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তিনি জমিদারবাড়ির পেছন দিকটা দেখতে গেলেন। একেবারেই জরাজীর্ণ অবস্থা। তিনি আবার বললেন, এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার।

দিনের আলো প্রায় নিভে আসছে। সন্ধ্যায় রাজবাড়ির সামনের দোকানে চায়ের আড্ডা বসল। সেখানে একজন মজা করে বললেন, ‘রাজার বংশধর এসেছে। সব জমিজমা ফেরত নেবে।’ তামাশাটা বুঝে সৈকত শেখরেশ্বর বললেন, ‘নাটোরে সবাই যেমন বনলতা সেনকে খুঁজতে আসে, আমিও তেমনি হারানো রাজ্যটা খুঁজতে এসেছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন