ডিজেলসংকটে চলছে না নৌকা, বিপাকে শরীয়তপুরের হাজারো জেলে

ডিজেলসংকটে জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না। কয়েক দিন ধরে নদীর ঘাটে পড়ে আছে নৌকাগুলো। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নড়িয়া উপজেলার চরলাউলানি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চরমোহন গ্রামের জেলে সিরাজুল ইসলাম ঢালীর বয়স ৫৫ পেরিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। বর্তমানে ছয়জন শ্রমিক নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মাছ ধরেন। কিন্তু ডিজেলসংকটের কারণে সাত দিন ধরে নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে পারছেন না।

শুধু সিরাজুল ইসলাম নন, একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার জেলে। নদীতীরবর্তী হাটবাজারগুলোতে ডিজেলের সংকটের কারণে তাঁদের নৌকা চলছে না। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে নদীতে যাচ্ছেন। তাঁদের লিটারপ্রতি ডিজেলে ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।

সিরাজুল ইসলাম আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘অভাবের সংসারে ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নদীতে নামি। এত বছরেও ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এখন সেই ইঞ্জিনই বিপদের কারণ হয়েছে। বাজারে তেল পাচ্ছি না তাই সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার ও শ্রমিকদের নিয়ে বিপাকে আছি—জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদী প্রবাহিত হয়েছে। জাজিরার নাওডোবা থেকে গোসাইরহাট উপজেলার নলমুরি পর্যন্ত প্রায় ৭১ কিলোমিটার নদীপথে প্রায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নৌকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন এক জেলে
ছবি: প্রথম আলো

আগে বইঠাচালিত নৌকা ব্যবহার হলেও এখন অধিকাংশ নৌকাতেই ইঞ্জিন বসানো হয়েছে। জেলায় অন্তত ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। এসব নৌকা চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।

নদীতীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ডিজেল বিক্রি করেন। তবে কয়েক দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছেন না তাঁরা। এ সুযোগে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

গোসাইরহাট উপজেলার গরিবেরচর এলাকার জেলে আবু সুফিয়ান (৪০) পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পদ্মা নদীতে মাছ ধরেন। ঈদের পরদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে তেলসংকটে পড়ে নড়িয়ার সুরেশ্বর এলাকায় পাঁচ দিন ধরে আটকে আছেন।
আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সুরেশ্বর বাজারে দুই লিটার করে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। তা–ও প্রতি লিটার ১৬০ টাকা। এই তেল দিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা মাছ ধরা যায়। কোনো দিন মাছ পাই, কোনো দিন পাই না। এভাবে কত দিন চলবে, জানি না।’

চাঁদপুরের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপো থেকে তেল এনে বিক্রি করেন বলে জানান সুরেশ্বর বাজারের ব্যবসায়ী রিফাত হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন তাঁর দোকানে তিন-চার হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। এ কারণে জেলেদের দিতে পারছেন না। আর বেশি দামে বিক্রির অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি তাঁর।

শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের আগপর্যন্ত জেলেদের জ্বালানি তেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের পর নদীতীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জেলেরা কিছু কিছু স্থানে জ্বালানি পাচ্ছেন না, এমন তথ্য পেয়েছি। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিগগিরই এমন সংকট কেটে যাবে।