‘গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে’—চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন থেকে রাউজান যেতে যেতে বারবার মনে পড়ছিল বাউল শাহ আবদুল করিমের এই গান। স্বাভাবিক সময়ে বাসে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে ৪০ মিনিট থেকে ৪৫ মিনিট। তবে ঈদের ছুটিতে আজ মঙ্গলবার সেই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।
সময়ের এই ব্যবধান শুধু ঘড়ির কাঁটার হিসাবে বোঝানো কঠিন। ভ্যাপসা গরমে গাড়ির ভেতরে বসে থাকা যাত্রীদের ক্লান্তি, শিশুদের কান্নায় প্রতিটি মুহূর্ত যেন দীর্ঘ হয়ে ধরা দিচ্ছিল। গন্তব্যে যেতে বাড়তি সময় লাগার মূল কারণ সড়কের ওপর বসানো পশুর হাট। এর সঙ্গে যানবাহনের অনিয়ম, সড়কের অব্যবস্থাপনা তো রয়েছেই।
চট্টগ্রামে আজ সকাল থেকেই ছিল থেমে থেমে বৃষ্টি। কখনো ঝিরঝির, কখনো ভারী। দুপুরের আগে বৃষ্টি থামে। এই ফাঁকে মানুষ বের হতে শুরু করে বাড়ির উদ্দেশে। সবারই যেন বাড়ি ফেরার তাড়া। কেউ বাড়িতে পৌঁছে কোরবানির প্রস্তুতি নেবেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঈদের বাজার সারবেন, কেউবা শুধু সময়মতো বাড়ি ফিরতে চান।
চট্টগ্রাম উত্তরের উপজেলা হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার বাসিন্দাদের যেতে হয় নগরের অক্সিজেন হয়ে। ঈদের ছুটিতে আমার গন্তব্যও নিজের গ্রামের বাড়ি রাউজান। সবার মতো হুড়োহুড়ি করেই বেলা আড়াইটার আগে অক্সিজেন থেকে একটি বাসে উঠে পড়ি। বাসে ওঠার সময় সহকারী ভাড়ার পরিমাণ শুনিয়ে দিলেন—রাউজান ৭০, গহিরা ৬০, হাটহাজারী ৫০ টাকা। অন্য সময়ে এই ভাড়া যথাক্রমে ৬৫, ৫৫ ও ৪০ টাকার মতো। বাড়তি ভাড়া নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। মুহূর্তেই বাসটি ভর্তি হয়ে গেল।
বেলা ঠিক আড়াইটায় বাস ছাড়ল। শুরুতে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু অদূরে আমানবাজার এলাকায় পৌঁছাতেই বদলে গেল দৃশ্য। বাসের গতি কমতে কমতে একসময় প্রায় থেমে গেল। সামনে গাড়ির সারি। যত দূর চোখ যায়, শুধু গাড়ি আর গাড়ি। বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, রিকশা—সব যেন একসঙ্গে আটকে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গরু বোঝাই ছোট ট্রাক। কোনো ট্রাকের পেছনে বাঁধা দু-তিনটি গরু, কোথাও আবার অনেকগুলো গরু ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে।
সড়কের পাশে পথে পথে বসেছে পশুর হাট। বড়দীঘির পাড়ের মোড় পেরোতেই চোখে পড়ে ছোট একটি হাট। সেখানে ক্রেতাদের ভিড়। হাটে শিশু-কিশোরদের কৌতূহলও কম নয়। তারা দল বেঁধে গরু দেখতে এসেছে। কারও চোখ বড়সড় সাদা গরুর দিকে, কারও নজর লালচে রঙের ষাঁড়ের দিকে।
সড়কের পাশের হাটে ভিড় বেড়েই চলছে। মানুষ দরদাম করছেন। কেউ গরুর দাঁত দেখছেন, কেউ পিঠে হাত বুলিয়ে ওজন আন্দাজ করছেন, কেউ আবার বিক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষিতে ব্যস্ত। দরে মিললেই পছন্দের গরু কিনে নিয়ে রওনা দিচ্ছেন হাট থেকে। হাট ঘিরে উৎসবের আমেজ। তবে সড়কে হাটের কারণে গন্তব্যে যেতে অপেক্ষার সময় বাড়ে বাসের যাত্রীদের।
গাড়ি এই বন্ধ হয় তো, এই চালু হয়। একটু এগোয়, আবার থামে। সামনে গাড়ি, পেছনেও গাড়ির সারি। গাড়ির ভেতরের মানুষের কেউ বিরক্ত, কেউ অস্থির। ঈদযাত্রা মানেই ভোগান্তি—এমনটাই ভেবে নিয়ে কেউ একেবারে নির্লিপ্ত।
বাসে ওঠার সময় সহকারী ভাড়ার পরিমাণ শুনিয়ে দিলেন—রাউজান ৭০, গহিরা ৬০, হাটহাজারী ৫০ টাকা। অন্য সময়ে এই ভাড়া যথাক্রমে ৬৫, ৫৫ ও ৪০ টাকার মতো। বাড়তি ভাড়া নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। মুহূর্তেই বাসটি ভর্তি হয়ে গেল।
গাড়ির ভেতরে সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছিল শিশুদের। মধ্যে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরম। বাসের ভেতরে বাতাস কম। জানালা বন্ধ করলে গরমে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এক শিশুকে দেখা গেল মায়ের কোলে কাঁদছে। মা কখনো হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন, কখনো পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। আরেক পাশে এক বৃদ্ধ চুপচাপ বসে আছেন। কপালে ঘাম, চোখে ক্লান্তি। একপর্যায়ে আসনেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।
আবুল হোসেন নামের ওই যাত্রী যাবেন ফটিকছড়ি। আমাদের গাড়ি যাবে সরাসরি রাউজান। তিনি নেমে যাবেন হাটহাজারীতে। আলাপে জানা যায়, গ্রামেই থাকেন। একটি কাজে নগরে এসেছিলেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, কেন এলেন, এ রকম অবস্থা জানলে আসতেন না।
গাড়ির ভেতরে তখন বারবার ফোন আসছে যাত্রীদের কাছে। স্বজনেরা হয়তো জিজ্ঞেস করছেন, ‘আর কদ্দূর’ ‘কতক্ষণ লাগবে’ ‘পৌঁছাইছ’। ওই প্রান্তের প্রশ্নগুলো অনুমান করা কঠিন নয়। কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে যাত্রীরাই যেন সংশয়ে পড়ে যান। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ ৪০ মিনিটে শেষ হয়, সেই পথ আজ কতক্ষণে শেষ হবে, তা কেউ জানে না। কেউ বলেন, ‘আরেকটু সামনে গেলেই হয়তো জট থাকবে না।’ কেউ বলেন, ‘চৌধুরীহাট পার না হওয়া পর্যন্ত কপাল খারাপ।’ আবার কেউ হতাশ গলায় বলেন, ‘আজ মনে হয় রাস্তায় দিন পার হয়ে যাবে।’
বড়দীঘির পাড় থেকে ফতেয়াবাদ পর্যন্ত ছিল মূল যানজট। চৌধুরীহাটে বসেছে বড় পশুর হাট। আশপাশের এলাকা থেকে ক্রেতারা সেখানে গরু কিনতে এসেছেন। কেউ ট্রাক নিয়ে, কেউ পিকআপ নিয়ে, কেউ ভ্যানে। হাটের ভিড় গিয়ে মিশেছে সড়কের যানবাহনের ভিড়ে। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, গরু ওঠানো-নামানো, রাস্তা পারাপার, হঠাৎ থেমে যাওয়া গাড়ি—সব মিলিয়ে পুরো সড়ক যেন স্থবির হয়ে পড়েছে।
যানজটে আটকে থাকতে থাকতে অনেকেই হাঁটা শুরু করলেন। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কাঁধে বস্তা। কেউ শিশু কোলে নিয়ে হাঁটছেন। কাছের গন্তব্যে যাঁদের বাড়ি, তাঁরা গাড়িতে বসে থাকার চেয়ে হাঁটাকেই ভালো মনে করলেন। কিন্তু যাঁদের যেতে হবে হাটহাজারী, রাউজান বা আরও দূরে, তাঁদের উপায় নেই। তাঁরা বসে থাকলেন গাড়ির ভেতরেই। অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
মাঝেমধ্যে বাস একটু গতি পেলে যাত্রীদের মুখে আশার আলো দেখা যায়। মনে হয়, এবার হয়তো ছাড়ল। কিন্তু কয়েক গজ এগিয়েই আবার থেমে যায় বাস। সামনের ট্রাকটি থেমে আছে। তার সামনে একটি গরুবাহী গাড়ি। তারও সামনে আরও অনেক যানবাহন।
হাটের ভেতরে তখন অন্য চিত্র। সেখানে উৎসব, দরদাম, হাসি, তর্ক, গরুর ডাক, শিশুদের উচ্ছ্বাস। আর সড়কে আছে অপেক্ষা, ক্লান্তি, বিরক্তি, অসহায়তা। একই জায়গায় ঈদের দুই বিপরীত ছবি। একদিকে কোরবানির পশু কেনার আনন্দ, অন্যদিকে ঈদযাত্রার ভোগান্তি।
এই পথের যাত্রীদের কেউ অভিযোগ করলেন না খুব জোরে। হয়তো জানেন, ঈদের আগে এমন ভোগান্তি নতুন নয়। তবে দু-একজন তারপরও বললেন, পশুর হাট বসবে, মানুষ গরু কিনবে, ঈদের আনন্দ থাকবে; কিন্তু যানবাহন যাতে ঠিকমতো চলে, তা–ও দেখা দরকার প্রশাসনের।
সব ঝক্কি পেরিয়ে বাস যখন রাউজানে পৌঁছায়, তখন সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা; অর্থাৎ রাস্তায় পার হয়ে গেছে ৫ ঘণ্টা। যে পথের দূরত্ব সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার। যাতায়াতে সময় লাগে বড়জোর ৪০-৪৫ মিনিট। আজ সেখানে লাগল ৫ ঘণ্টা। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো তোড়জোড়ই চোখে পড়ল না।
ঈদের লম্বা ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার মুহূর্ত হওয়ার কথা আনন্দময়। কিন্তু যাত্রাপথে যাত্রীদের কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হবে? শিশু, বৃদ্ধ মানুষদের এমন দুর্ভোগ কি অনিবার্য?