পটুয়াখালীতে বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে গিয়ে বন ধ্বংস, মুখোমুখি পাউবো ও বন বিভাগ

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। সম্প্রতি মৌডুবী ইউনিয়নের ভাঙারখাল এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন রাবনাবাদ উপকূলের বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে গিয়ে সামাজিক বনায়নের সাত শতাধিক গাছ উজাড় করা হয়েছে। বাঁধ সংস্কারের মাটি খনন করতে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঠিকাদার খননযন্ত্র দিয়ে গাছগুলো উপড়ে ফেলেন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে বন বিভাগ ও পাউবো।

বন বিভাগের ভাষ্য, সামাজিক বনায়নের গাছ কাটতে দরপত্র আহ্বান করতে হয়। পাউবোর চিঠি পাওয়ার পর তেমন সময় ছিল না। সময় চাইলেও পাউবো সময় না দিয়ে নিজেদের মতো গাছ উপড়ে ফেলেছে। অন্যদিকে পাউবো বলছে, বন বিভাগকে চিঠি দিলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বর্ষার আগে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করলে চরম জটিলতা তৈরি হবে। উপকূলের জানমাল রক্ষায় কাজ শুরু করতে তারা বাধ্য হয়েছে।

সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী ব্যক্তিরা জানান, ২০০৩-০৪ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বনায়নের গাছ লাগানোর পর থেকে তাঁরা রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিলেন। কিন্তু পাউবোর ঠিকাদার বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে গিয়ে সাত শতাধিক গাছ খননযন্ত্র দিয়ে উপড়ে দিয়েছে। গাছগুলো এমনভাবে দুমড়েমুচড়ে দেওয়ায় ইটভাটা ও রান্নার কাজে ছাড়া অন্য কোথাও বিক্রি করা যাবে না। এতে উপকারভোগী ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

গত শুক্রবার সরেজমিন দেখা যায়, মৌডুবী ইউনিয়নসংলগ্ন রামনাবাদ নদীর তীরে কাজিকান্দা, নিজকাটা, কেউর হাওলা ও ভাঙারখাল এলাকার প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়ক সংস্কার করছে পাউবো। এর মধ্যে ভাঙারখাল এলাকায় মেহগনি, রেইনট্রিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৭০০ গাছ উপড়ে দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের উপকারভোগী কমিটির সভাপতি মো. আক্কাস ফরাজী প্রথম আলোকে বলেন, মৌডুবী এলাকায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে বনায়ন করেছে বন বিভাগ। এর মধ্যে পাউবোর সংস্কারাধীন এলাকায় ৩২৫ জন উপকারভোগী আছেন, যাঁরা নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করেন। তিনি বলেন, প্রায় দুই হাজার গাছ চিহ্নিত করে দরপত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বন বিভাগ। কিন্তু পাউবো ও তাদের ঠিকাদার ভাঙারখাল এলাকায় মাটি কাটতে গিয়ে প্রায় ৭০০ গাছ উপড়ে দিয়েছে। বাকি এলাকার বাঁধ ঠিক করতে গেলে আরও দেড় হাজার গাছ ধ্বংস হতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারের প্রতিনিধি মো. জামাল বলেন, ‘বর্ষাকাল শুরুর আগেই কাজ শেষ করতে হবে। পাউবোর নির্দেশেই কাজ শুরু করেছি। তারা বললে আবার কাজ বন্ধ রাখব।’

বন বিভাগের স্থানীয় বিট কর্মকর্তা মো. শোয়েব বলেন, বনায়নের গাছ কাটার জন্য দরপত্র দিতে কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। ওই এলাকার বনায়ন অপসারণে পাউবো চিঠি দিলে প্রায় দুই হাজার গাছ চিহ্নিত করে দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। যথাসময়ে দরপত্র দিতে না পারায় তাঁরা পাউবোর কাছে সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু পাউবো সময় না দিয়ে গাছ উপড়ে ফেলে। কয়েকবার বাধা দিলেও শোনেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বন বিভাগের রাঙ্গাবালী উপজেলা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সবশেষ গাছের টেন্ডার হয় ১০ জানুয়ারি। আর পাউবো চিঠি দেয় ২৬ জানুয়ারি। এ সময়ে গাছ অপসারণের সুযোগ ছিল না। তবুও সময় চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু পাউবো সময় না দিয়ে নিজেদের মতো গাছ উপড়ে ফেলেছে।

যোগাযোগ করলে পাউবো কলাপাড়া সার্কেলের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, সামনে বর্ষাকাল। রাবনাবাদ নদীঘেঁষা কেউর হাওলা, কাজিকান্দা, নিজকাটা ও ভাঙারখাল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ৪ হাজার ৪৩৫ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ২৫ জানুয়ারি বন বিভাগকে বনায়ন অপসারণে চিঠি দেওয়া হয়, কিন্তু বন বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, বর্ষার আগে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করলে চরম জটিলতা তৈরি হবে। তাই উপকূলের জানমাল রক্ষায় কাজ শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এতে কিছু গাছ নষ্ট হয়েছে।