জামালপুর সদর উপজেলার চরচন্দ্রা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ বজলু শেখ (৬৫) চার বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। ৯-১০ দিন আগে একবার জমিতে অল্প কিছু সেচ দেন। তপ্ত রোদে সেই পানি পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। এখন পানির অভাবে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধানের চারা ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে, অথচ খেতের পাশেই থাকা ডিজেলচালিত পাম্পটি যেন এখন একপ্রকার অচল। কারণ, কোথাও মিলছে না ডিজেল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো জেলাতেই ডিজেলচালিত সেচপাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকেরা এমন সংকটে পড়েছেন। প্রতিদিন তেলের পাম্প ও খুচরা দোকানে ঘুরেও তাঁরা তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের চাপের কারণে কৃষকদের জন্য তেল পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এভাবে আর কয়েক দিন সেচ দিতে না পারলে বোরো আবাদে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। ফলে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সদরসহ সাতটি উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৩২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। জেলায় ডিজেলচালিত সেচপাম্প ৩৬ হাজার ও বিদ্যুৎচালিত ১৯ হাজার ৭০০ সেচপাম্প রয়েছে।
আজ বুধবার সকালে জামালপুর সদর উপজেলার ঝিনাই নদের পূর্বপাড়ের চরচন্দ্রা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীর ঘেঁষে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। চোখ যত দূর যায়, শুধু ধানখেত। ঝিনাই নদ পেরিয়ে মাটির সরু পথ ধরে এগোতেই একটি ধানখেতের পাশে চোখে পড়ে, একটি ডিজেলচালিত সেচপাম্প পড়ে আছে। যেন বহুদিন ধরেই তার কোনো কাজ নেই। পাম্পের পাশেই বসে আছেন কৃষক মোহাম্মদ বজলু শেখ। গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা তাঁর মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কাছে গিয়ে দেখা যায়, পাম্প চালু করার মতো তেল নেই। পানির অভাবে ধানের চারা ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে পড়ছে।
তেলের অভাবে ঠিকমতো আবাদই করতে পারছি না। এক দিন কোনোভাবে পানি দিতে পারলেও পরের সাত দিনেও আবার সেচ দিতে পারি না। প্রতিদিনই তেলের পাম্পে ঘুরছি।
এ সময় তাড়াহুড়া করে সেখানে এসে যোগ দেন আরেক কৃষক মো. মামুন মিয়া। তিনিও একই সমস্যার কথা জানান। জ্বালানি তেলের অভাবে খেতে সেচ দিতে না পেরে তাঁরও দিশেহারা অবস্থা।
কৃষক মোহাম্মদ বজলু শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেলের পাম্পে বারবার যাই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়। কোনো কোনো সময় হঠাৎ করে এক-দুই লিটার তেল দেয়, কিন্তু এই সামান্য তেলে আমাদের কাজ চলে না। খেতের অবস্থা নিজের চোখেই দেখেন। মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ধান এখন থোড় হওয়ার সময়, এ সময় নিয়মিত পানি দরকার। কিন্তু আমরা পানি দিতে পারছি না। এখন যদি সেচ দিতে না পারি, তাহলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।’
চরচন্দ্রা এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রয়েছে ১০ থেকে ১২টি ডিজেলচালিত সেচপাম্প। সেগুলো এখন প্রায় সবই অচল। একের পর এক খেত ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। কোথাও পানি নেই, সব জমির মাটি শুকিয়ে ফেটে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার শরিফপুর, মাছিমপুর, হাটচন্দ্রা ও মেলান্দহ উপজেলার চার নম্বর চর এলাকায়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে। ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল অধিকাংশ কৃষকই পড়েছেন চরম সংকটে।
জেলায় ৭০ শতাংশ কৃষিজমি বিদ্যুৎচালিত সেচের আওতায় রয়েছে বলে দাবি জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ শরীফ আলম খানের। এ মুহূর্তে ধানখেতে পর্যাপ্ত সেচ দরকার উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা, গ্রামের কৃষকেরা তেলের জন্য পাম্প পর্যন্ত যাচ্ছেন। তেল না পেয়ে অনেকেই ফেরত যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা উপজেলা কৃষি অফিস পর্যন্ত যাচ্ছেন না। তাঁরা যদি কৃষি অফিস পর্যন্ত যেতেন, নিশ্চয়ই তেলের ব্যবস্থা হতো। তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না, বিষয়টি সত্য। কীভাবে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা যায়, বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
মেলান্দহ উপজেলার চার নম্বর চর এলাকার কৃষক মো. মামুন মিয়া তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। তাঁর নিজের একটি ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে, যার আওতায় আরও প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে তিনি পানি দিয়ে থাকেন। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটে এখন সেই পাম্পই প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘তেলের অভাবে ঠিকমতো আবাদই করতে পারছি না। এক দিন কোনোভাবে পানি দিতে পারলেও পরের সাত দিনেও আবার সেচ দিতে পারি না। প্রতিদিনই তেলের পাম্পে ঘুরছি। কোনো দিন যদি তেল দেয়ও, তখন মাত্র দুই লিটার দেয়। অথচ আমার প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল লাগে। এই সামান্য তেলে কোনোভাবেই কাজ চলে না। পানির অভাবে আমাদের ধানখেত শুকিয়ে যাচ্ছে, একপ্রকার মরে যাচ্ছে। তেলের জন্য দিনভর ছোটাছুটি করছি, কিন্তু কোথাও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন পাম্পে শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে তেল বিক্রির কার্যক্রম চলছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসন তদারক করে যাচ্ছে। সমস্যা হলো, পাম্পগুলোয় মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের ব্যাপক ভিড় থাকে। সেগুলোর কিছু করতে গেলেই, আবার বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কৃষকদের বিষয়টি নিয়ে আমরা আলাদাভাবে চিন্তা করব। কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁদের তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে যাতে বোরো চাষের কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।’