২৫০ শয্যার নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন ৩০ জন
প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ২৫০ শয্যার সেবা চালু হয়নি।
নেত্রকোনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮৫০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও অনুমোদিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ। হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখানে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হয়নি। পুরোনো জনবল দিয়েই চলছে কার্যক্রম।
চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে সংকট থাকায় সরকারি এই হাসপাতালে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালটিকে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২৫০ শয্যার কার্যক্রমের জন্য ৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ তলা একটি নতুন ভবনও নির্মাণ করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ২৫০ শয্যার সেবা চালু করা যায়নি।
১০০ শয্যার হিসাবে হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কসহ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৬৮টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ জন চিকিৎসক। শূন্য পদ আছে ৩৮টি। এর মধ্যে ১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের ৭টি এবং ১২টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের ৬টি শূন্য। চিকিৎসক ছাড়াও দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৭টি পদের মধ্যে ৪২টি, তৃতীয় শ্রেণির ৪২টির মধ্যে ১৯টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে ১০টি পদ শূন্য রয়েছে।
রোগীর চাপ বাড়ছে, সংকটে সেবা ব্যাহত
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬ জন রোগী। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৬৪৪ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সম্প্রতি রোগীর চাপ আরও বেড়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪২১ জন। পরদিন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৬ জনে। অনুমোদিত ২৫০ শয্যার বিপরীতে দুই দিনেই অতিরিক্ত ১৭১ থেকে ১৭৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
আটপাড়ার বানিয়াজানের নুরুল আমীন শ্বাসকষ্ট নিয়ে চার দিন ধরে ভর্তি ছিলেন। তিনি বলেন, সব সময় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। সমস্যা বেশি হলে জরুরি বিভাগে যেতে হয়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মাজাহারুল আমীন বলেন, অর্ধেকের বেশি জনবলসংকট নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে দেড় থেকে দুই শ রোগী দেখতে হয়।
২০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসকসংকটের অভিযোগ পাওয়া যায়। বারহাট্টার ফকিরেরবাজার এলাকা থেকে আড়াই মাসের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মারুফ মিয়া। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে শিশুর জ্বরের চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় কম।
আটপাড়ার বানিয়াজানের নুরুল আমীন শ্বাসকষ্ট নিয়ে চার দিন ধরে ভর্তি ছিলেন। তিনি বলেন, সব সময় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। সমস্যা বেশি হলে জরুরি বিভাগে যেতে হয়।
আইসিইউ নেই, নষ্ট দুটি অ্যাম্বুলেন্স
চিকিৎসকসংকটের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবাতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখনো চালু হয়নি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও উচ্চ নির্ভরশীলতা কেন্দ্র (এইচডিইউ)।
জনবল বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হয়েছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম এগোবে।
হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সই দুই বছরের বেশি সময় ধরে নষ্ট। মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি অ্যাম্বুলেন্স এনে বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সেটি বেশির ভাগ সময় মেডিক্যাল টিমের কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় রোগী পরিবহনের জন্য পাওয়া যায় না।
চাওয়া হয়েছে ২২৯ নতুন পদ
২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালাতে আরও ২২৯টি নতুন পদের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১১১টি পদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরপর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক একরামুল হাসান বলেন, এখনো ওষুধ, খাবারসহ অনেক ক্ষেত্রে ২৫০ শয্যার অনুপাতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। চোখ, নাক-কান-গলা ও অবেদনবিদসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সিনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। চোখের চিকিৎসকের পদ দুই দশক ধরে শূন্য। জনবল বাড়ানো গেলে আইসিইউ, সিসিইউ চালু করা সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জনবল বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হয়েছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম এগোবে।