ফিকে হচ্ছে গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ির সকাল শুরু হতো এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাসে। শীতের কুয়াশামাখা ভোরে চুলার পাশে বসে ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠার সঙ্গে নতুন গুড়ের মেলবন্ধন ছাড়া বাঙালির শীত যেন ছিল অপূর্ণ। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই গুড়। বাটিভর্তি মুড়ি কিংবা রাতের বেঁচে যাওয়া পান্তাভাতের সঙ্গে একটুখানি গুড়—এর স্বাদ যেন ছিল একেবারে অমৃত।
গুড় কেবল একটি খাবার নয়, এটি আবহমান বাংলার আতিথেয়তা আর ভালোবাসার এক অনন্য স্মারক। বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে গুড়, মুড়ি আর শীতের পিঠাপুলির সুবাস। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় শহরের বন্ধুকে গ্রামের বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে লিখেছিলেন—
‘তুমি যাবে ভাই—যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
...
খেজুর গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুম মুড়ির খই,
আঁজলা ভরিয়া খাইতে দেব, করিও না কেহ হৈ।’
কেবল কবিতায় নয়, কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কিংবা ‘ইছামতী’ উপন্যাসের পাতা ওলটালেই দেখা যায় গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই গুড়ের উপস্থিতি। কাঁসার বড় বাটিতে মুড়ি আর সঙ্গে এক টুকরো পাটালি গুড়—অপুদের শৈশব বা সাধারণ গ্রামবাসীর কাছে এ যেন ছিল এক রাজসিক আয়োজন। সাহিত্য পাতায় দেশের ঐতিহ্যবাহী এই পণ্য কেবল একটি খাবার নয়, এটি আবহমান বাংলার আতিথেয়তা আর ভালোবাসার এক অমলিন প্রতীক। কালের বিবর্তনে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সেই চিরায়ত রূপ আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ। আর সেই পরিবর্তনের এক করুণ সাক্ষী হয়ে আজ নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদীর তীরের ঐতিহ্যবাহী টরকী বন্দর।
ঐতিহ্যের সেই জমজমাট হাট
টরকী-বাশাইল ও টরকী-সাউদের খালবেষ্টিত মাদারীপুর ও বরিশালের সীমান্তবর্তী এই টরকী বন্দর একসময় পরিচিত ছিল দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে। সাপ্তাহিক হাটের দিনে এই বন্দর রূপ নিত এক জনসমুদ্রে। হাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল থরে থরে সাজানো গুড়ের ‘জালা’ (মাটির বড় পাত্র)। বাতাসে ভেসে বেড়াত আখ আর খেজুর গুড়ের মনমাতানো ঘ্রাণ। অন্তত ৩৪টি পাইকারি আড়ত আর শত শত খুচরা বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর থাকত এ এলাকা। এখন এই বাজারে ঘুরলে তা চোখে পড়ে না। আজ সেই জৌলুশ কেবলই ধূসর ইতিহাস। ৩৪টি আড়তের জায়গায় আজ টিকে আছে মাত্র দুটি।
শতবর্ষী ব্যবসার প্রদীপ: রাহুল স্টোর
এই বাজারে সাহা বাবুদের গুড়ের ব্যবসা—পারিবারিকভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলছে। বাজারে টিকে থাকা শত বছরের পুরোনো দোকানের একটি হলো ‘রাহুল স্টোর’, যা একসময় ‘সাহা বাবুর গুড়ের দোকান’ নামেই একডাকে পরিচিত ছিল। শতবর্ষী এই পারিবারিক ব্যবসার হাল এখন ধরে আছেন দুই ভাই—রতন সাহা ও স্বপন সাহা এবং তাদের সন্তানেরা। তাদের বাবা জগদীশ চন্দ্র সাহা এখানে ব্যবসা শুরু করেছেন। এই দোকানে তিন প্রজন্ম ধরেই ব্যবসা চলছে। এর আগে তাদের পূর্বপুরুষেরা বাজারের উন্মুক্ত স্থানে ব্যবসা করতেন। জগদীশ চন্দ্র সাহা স্থায়ী ব্যবসা শুরুর আগেও এই দোকানে (রাহুল স্টোর) অন্য বণিকেরা গুড়ের ব্যবসা করতেন।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে স্বপন সাহা বলেন, আগে হাটের দিনে দোকানভর্তি কর্মচারী থাকত। দুজন ‘সরকার’ (হিসাবরক্ষক) আর আট-দশজন সুঠাম দেহের শ্রমিক দিনভর গুড়ের জ্বালা ট্রলারে ওঠানো-নামানো করত। এখন সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের জায়গায় মাত্র একজন সরকার আর একজন শ্রমিক কাজ করছেন।
আগে নড়াইল থেকে নৌপথে আসত বিখ্যাত ‘পাতিল গুড়’। প্রতি পাতিলে এক মণ গুড় থাকত। গুড়ের মৌসুমের সময় হাটের দিনে বণিকেরা প্রায় ৪ হাজার পাতিল গুড় নিয়ে আসতেন এই বন্দরে। আজ মাঠপর্যায়ে দেশি আখের চাষ কমে যাওয়া এবং উচ্চফলনশীল আখের মিষ্টত্ব কম হওয়ায় গুড়ের সেই আদি স্বাদ ও গন্ধ—দুই-ই হারিয়েছে। শুধু আখের গুড় নয়, খেজুরের গুড়েরও কদর ছিল বেশ। এখন খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় বাজারে এই গুড়ের সরবরাহও কমেছে।
চিনি বনাম গুড়
বাজারের অপর আড়ত ‘সাহা এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী অরুণ কুমার সাহা ৩২ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তাঁর গুড় একসময় চট্টগ্রাম ও চাঁদপুর পর্যন্ত যেত। এখন কেন সীমিত হচ্ছে এমন প্রশ্নে অরুণ বাবুর কণ্ঠে আধুনিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ফুটে ওঠে। বললেন, ‘টিভি বা মিডিয়ায় চকলেট-বিস্কুটের চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপন থাকলেও দেশীয় এই ঐতিহ্যের কোনো প্রচার নেই।’ তবে মান ধরে রাখতে তিনি আজও নিজেই চলে যান প্রত্যন্ত গ্রামের চাষির বাড়ি, নিজের চোখে গুড় তৈরি দেখে তবেই আড়তে আনেন।
আড়তদারদের চেয়েও বেশি করুণ অবস্থা খুচরা বিক্রেতাদের। টরকীর পুরোনো টোল ঘরে গেলে দেখা মেলে ৯০ ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ ব্যবসায়ী হোসেন খাঁর। ৪০ বছর ধরে তিনি এখানে গুড় বেচেন।
‘আগে হাটের দিনে পাঁচ-ছয় মণ গুড় একাই বিক্রি করতাম। আর আজ সারা দিন বসে থেকেও এক কেজি গুড় বেচতে হিমশিম খেতে হয়,’ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আক্ষেপ করেন তিনি।
হারিয়ে যাওয়া শৈশব
হাটে শখের বশে গুড় কিনতে আসা সুরেশ দাসের চোখে তখন নস্টালজিক শৈশব। গরম জাউ ভাতের সঙ্গে এক টুকরো গুড়ের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি জানান, শরীর সায় দেয় না, ডাক্তার নিষেধ করেছেন, তবু সেই পুরোনো স্বাদের টানে ছুটে আসেন। কিন্তু ভেজাল আর রাসায়নিকের ভিড়ে সেই ‘আসল’ গুড় আর আগের মতো পাওয়া যায় না।
পালরদী নদীর জল অনেক গড়িয়েছে। আধুনিকতার চাপে প্যাকেটজাত খাবার আর চিনির আধিপত্যে বাংলার চিরচেনা গুড়ের ঐতিহ্য আজ প্রান্তিক পর্যায়ে। রতন সাহা বা স্বপন সাহারা তাঁদের সন্তানদের আর এই ব্যবসায় আনতে চান না। হয়তো আর কয়েক বছর পর টরকী বন্দরের এই শেষ আড়তগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন বাতাসের সেই মিষ্টি সুবাস আর মিলবে না, কেবল পুরোনো মানুষের আড্ডায় গল্পের খোরাক হয়ে বেঁচে থাকবে টরকী বন্দরের সেই হারানো দিনের রূপকথা।