গত শনিবার বিকেল চারটার দিকে রায়পুরার মির্জারচর ইউনিয়নের শান্তিপুর বাজার এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন স্থানে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন চেয়ারম্যান জাফর ইকবাল। এ সময় স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ চেয়ারম্যানকে দ্রুত উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। জাফর ইকবাল রায়পুরার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল মির্জারচর ইউপির পরপর দুইবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর নিহত চেয়ারম্যানের স্ত্রী মাহফুজা আক্তার বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে রায়পুরা থানায় মামলা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, মির্জারচর ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জেরে ইউপি চেয়ারম্যান জাফর ইকবালকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ আগেই এর পরিকল্পনা করেছিলেন আসামিরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বর বিকেলে ইউনিয়নটির শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটি সভা শেষে ফেরার পথে চেয়ারম্যান জাফর ইকবালকে গুলি করে হত্যা করেন আসামিরা। এর দুই দিন পর নিহত ব্যক্তির স্ত্রী মাহফুজা আক্তার বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় মামলা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ বলে, ইউপি চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে এর ছায়া তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মামলা হওয়ার আগেই দুজনকে আটক করে তারা, পরে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ডিবি পুলিশের চলমান এ অভিযানের মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রায়পুরার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে রমজান মিয়া ও রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুজনই চেয়ারম্যান জাফর ইকবলাকে হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

এ হত্যাকাণ্ড মামলার এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে জানিয়ে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, এরই মধ্যে এজাহারভুক্ত তিন আসামিসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিরা পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার রমজান মিয়ার বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় তিনটি হত্যাসহ মারামারি ও বিস্ফোরক আইনে চারটি মামলা এবং একই থানায় রাসেলের বিরুদ্ধে চারটি হত্যাসহ মারামারি ও বিস্ফোরক আইনে পাঁচটি মামলা রয়েছে। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মামলার আসামিরা হলেন ফারুকুল ইসলাম ওরফে ফারুক, ফিরোজ মিয়া, আবু সাইদ, ফরিদ ব্যাপারী, সাইদুর রহমান, মো. ইব্রাহীম, মহরম আলী, লাল মিয়া, বাবুল মিয়া, ফয়সাল আহমেদ, মো. দুলাল, মো. ইয়ালী, নাসির মিয়া, মজিবুর রহমান, রাসেল ওরফে এবাদুল্লাহ, মো. নাসির, মো. রমজান, রহমত উল্লাহ, মো. শাহজালাল, মো. জালাল ও মো. কামাল। তাঁদের সবার বাড়ি মির্জারচর ও পার্শ্ববর্তী বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।

নিহত ব্যক্তির পরিবার ও স্থানীয় লোকজন জানান, ২০১৫ সালে মির্জারচর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন ফারুকুল ইসলাম। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাফর ইকবাল। পরে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান ফারুকুল ইসলামের বাবা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মিয়া। তাঁর সঙ্গেও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন জাফর ইকবাল। তাঁর কাছে পরাজয়ের জেরে ছয়-সাত বছর ধরে জাফরের প্রতিপক্ষে পরিণত হন ফারুকুল ও ফিরোজ মিয়া। বিভিন্ন সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় লোকজন আরও জানান, গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই এলাকাছাড়া ছিলেন ফিরোজ মিয়ার শতাধিক কর্মী-সমর্থক। ওই দিন সন্ধ্যায় নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে পরাজিত প্রার্থীর লোকজন এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। গত শুক্রবার পর্যন্ত তাঁরা এলাকার বাইরে ছিলেন। গত শুক্রবার বিষয়টির সমাধানের জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আপস-মীমাংসার জন্য বসে দুই পক্ষ। তাৎক্ষণিক সমাধান না হওয়ায় পরবর্তী শুক্রবার আবার বসার তারিখ নির্ধারণ করে ফিরোজের কর্মী-সমর্থকেরা সভা ছেড়ে চলে যান। পরদিন, অর্থাৎ গত শনিবার বিকেলে চেয়ারম্যান জাফর ইকবালকে হত্যা করা হয়।