ভোট দেবেন, তাই সুন্দরবন থেকে বাড়ি ফিরছেন বনজীবীরা
সুন্দরবনের গহিনে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন কামরুল ইসলাম। জাল-দড়ি আর নৌকা নিয়ে গতকাল সোমবারই বাড়ি ফিরে এসেছেন তিনি।
খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কামরুলের সঙ্গে কথা হয়। নদীর চরে বাঁধা নৌকার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার একটু আগেভাগেই ফিরতি হইছে। রাজার ভোট সামনে। নিজের পছন্দের প্রার্থীরে ভোট দিতি পারবানে, এইডা ভাইবে আমরা একসাথে অনেক জাইলে ফিরিছি।’
কামরুল ইসলামের মতো সুন্দরবনের ভেতরে থাকা আরও অনেক জেলে এবার মাছ ধরা বন্ধ করে আগেভাগেই লোকালয়ে ফিরেছেন। আজ মঙ্গলবার সকালে কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন জোড়শিং গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে শতাধিক জেলে ইতিমধ্যে জাল-দড়ি গুটিয়ে গ্রামে ফিরেছেন। শাকবাড়িয়া নদীর চরে সারি সারি নৌকা বাঁধা। একই চিত্র দেখা গেছে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন সুতিয়া বাজারের পাশের নদীতীরেও—সেখানে অর্ধশতাধিক মাছ ধরার নৌকা ভিড়ে আছে।
কয়রার বানিয়াখালী গ্রামের বনজীবী জেলে নিশিকান্ত মণ্ডল বলেন, তাঁদের গ্রামে পাঁচ শতাধিক বনজীবী পরিবার বসবাস করে। কিন্তু আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় বনদস্যুদের হাতে। তিনি আরও বলেন, ‘ভোটের জন্যি সবাই জঙ্গল থেইকে ফিরতিছে। কয়দিন ধইরা ভোট চাইতে লোকজন গ্রামে আসতিছে। তাগো কইছি, আমাগের এই ডাকাতির সমস্যা যে মেটাতে পারবে, তাকেই ভোট দ্যাব।’
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেরাই শুধু নন, উপকূলীয় কয়রা উপজেলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বছরের এই সময়ে কাজের খোঁজে এলাকার বাইরে থাকেন। কেউ ধান রোপণে, কেউ ইটভাটায়, আবার অনেকে শহরে দিনমজুরির কাজ করেন। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ উপজেলায় এমন শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় অর্ধলাখ। ভোট সামনে রেখে কয়েক দিন ধরে তাঁরা দলে দলে এলাকায় ফিরছেন।
ঢাকার একটি ইটভাটা থেকে ভোট দিতে বাড়ি ফিরেছেন কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের গাউস মালী, শফিকুল গাজী, রমজান সরদার ও সাইফুল সানা। শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী সুতিয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, ভোট দেওয়ার কথা বলে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন। এতে আর্থিক ক্ষতি হলেও দীর্ঘদিন ভোট না দেওয়ার আক্ষেপ ঘোচাতেই এই ফেরত আসা।
সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান বলেন, ভোটকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে সুন্দরবন থেকে জেলেরা লোকালয়ে ফিরে এসেছেন। এ সময়ের মধ্যে নতুন করে কেউ বনে প্রবেশের অনুমতিও নেননি। ভোটের মৌসুমে জেলেদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপরাধী যেন বনে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কয়রা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুজ্জামান বলেন, বনজীবী মানুষের প্রত্যাশা—নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন তাঁদের জীবিকা, নিরাপত্তা ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেন।