ভবদহে জলাবদ্ধতা
যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি, ‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান
‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘অবিলম্বে টিআরএম বাস্তবায়ন চাই’, ‘নদী খনন এবং টিআরএম একই সঙ্গে করতে হবে’—এসব স্লোগানে যশোরের জলাবদ্ধ ভবদহ অঞ্চলের কয়েক শ নারী-পুরুষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গণ–অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। চার দফা দাবিতে আজ সোমবার দুপুর ১২টার থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালিত হয়।
এ কর্মসূচির ডাক দেয় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। অবস্থান কর্মসূচি শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, আইডব্লিউএমের (ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং) চলমান সমীক্ষায় যশোরে জাতীয় কর্মশালায় আইডব্লিউএম উত্থাপিত বিলে পর্যায়ক্রমে টিআরএম বাস্তবায়ন এবং নদী খনন ও টিআরএম একই সঙ্গে বাস্তবায়ন, জরুরি ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কাজ সম্পন্ন এবং সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা, এই মুহূর্তে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া সেতুর দক্ষিণ পাশে হরি নদের আড়বাঁধসহ সব আড়বাঁধ অপসারণ করা এবং খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত হরি নদের দ্রুত পলি অপসারণ করা এবং পানিবন্দী মানুষের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্যনিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ–নদীর জোয়ারভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা ব্যয়ে টেকা, হরি, শ্রী, আপার ভদ্রা ও তেলিগাতী নদ–নদী এবং হরিহর নদের ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় গত জুলাই মাসের অতিবর্ষণে ভবদহ অঞ্চলের যশোরের মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর; খুলনা জেলার ফুলতলা, ডুমুরিয়া উপজেলার শতাধিক গ্রামের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ।
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। গত জুলাই মাসের অতিবর্ষণে ভবদহ অঞ্চলের যশোরের মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর; খুলনা জেলার ফুলতলা, ডুমুরিয়া উপজেলার শতাধিক গ্রামের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।
আজ দুপুরে ১২টার দিকে ভবদহ জলাবদ্ধ এলাকার পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ ‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান দিতে দিতে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আসেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘বিলে বিলে টিআরএম চালু করো’, ‘এলাকার সকল নদী ও খাল পুনরুদ্ধার ও অবমুক্ত করো’, ‘অপরিকল্পিত ঘের নয়, পানিপ্রবাহে সকল বাধা উচ্ছেদ করতে হবে’, ‘আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করো’ ইত্যাদি। এরপর তাঁরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। বেলা তিনটা পর্যন্ত সেখানে তাঁরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
এ সময় বক্তব্য দেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান, কমিটির সদস্যসচিব চৈতন্য পাল প্রমুখ। এ ছাড়া দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, সাংস্কৃতিক কর্মী সানোয়ার আলম খান দুলু, মুক্তেশ্বরী বাঁচাও আন্দোলনের সদস্যসচিব রাশেদ খান প্রমুখ।
বাড়ির উঠোনে হাঁটুজল। ঘরে জল ছুঁই ছুঁই করছে। সেখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই।অনিমা বিশ্বাস, গৃহবধূ
বক্তারা বলেন, ৪৫ বছর ধরে পালাক্রমে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে আসছে। ওই জনপদের মানুষের উদ্ভাবিত নদী, পলি ও পানিব্যবস্থার অষ্টমাসী বাঁধপ্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে ষাটের দশকে আরোপিত কর্ডন পলিসি এর জন্য দায়ী। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা অপচয় শুধু নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস ও জনপদের স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনছে।
‘বাড়ির উঠানে হাঁটুজল’
অবস্থান কর্মসূচিতে এসেছিলেন মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের গৃহবধূ কমলা বৈরাগী(৬৫)। তিনি বলেন, ‘বাড়িঘরে জল উঠেছে। থাকা যাচ্ছে না। জল সরানোর জন্য এখানে এসেছি।’
উপজেলার কুলটিয়া গ্রামের গৃহবধূ অনিমা বিশ্বাস (৫৫) বলেন, ‘বাড়ির উঠোনে হাঁটুজল। ঘরে জল ছুঁই ছুঁই করছে। সেখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। গোয়ালে জল। রান্নঘরে জল। গরু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে খুবই খারাপ অবস্থায় আছি।’
অভয়নগর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক তুষার সরকার (৬০) বলেন, ‘ঘরে জল। বিলে জল। খুবই কষ্টে আছি। বিলে ফসল না হওয়ায় অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। টিআরএম চালু, জল সরানো এবং বিলে ধান করার জন্য এখানে এসেছি।’
ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভবদহে নদী খননের সঙ্গে সঙ্গে টিআরএম বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে নদী পুনরায় ভরাট হয়ে যাবে। নদী খননের ১৪০ কোটি টাকা অপচয় হবে।