মাঠে সক্রিয়তা, পারিবারিক উত্তরাধিকার—আফরোজার বিপুল জয়ের পেছনের কারণ

আফরোজা খান রিতাছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর থেকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা। এই বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার নেপথ্যে কয়েকটি বিষয়টি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, আফরোজা খানম পেয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট। স্বাধীনতার পর এই আসনে তিনিই একমাত্র নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। এই আসনে প্রার্থী ছিলেন মোট নয়জন।

যে কারণে বিপুল ভোটে জয়

জেলার রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি এবং দলীয় নেতারা বলছেন, আফরোজা খানমের বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই তিনি নির্বাচনী এলাকার এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ভোটারদের কাছে ছুটে গেছেন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের আস্থা অর্জনে তাঁদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন আফরোজা খানম।

এ ছাড়া মানিকগঞ্জকে বিএনপির দুর্গ হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। শুরুতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছুটা বিভেদ থাকলেও পরে সবাই আফরোজা খানমের সমর্থন দেন। তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আফরোজা খানমের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নামেন। আর জামায়াতের প্রার্থী না থাকায় ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয় অর্জন সহজতর হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, বাবা হারুণার রশিদ খান মুন্নুর উত্তরসূরি হিসেবেও নির্বাচনে বিজয়ের পথ সুগম হয় আফরোজা খানমের। কারণ, তাঁর বাবা চারবার সংসদ সদস্য থাকাকালে জেলায় বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত অর্থসহায়তা করেছেন। বাবার সেই কাজও তাঁর নির্বাচনে বিজয়ে সহায়তা করেছে।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য আ ফ ম নূরতাজ আলম বাহার প্রথম আলোকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে জেলায় দল ও দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত রেখেছেন আফরোজা খানম। হামলা, মামলার শিকার নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুধু দলীয় নেতা-কর্মীই নন, ভোটারদের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেছেন। যে কারণে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

মানুষের ভালোবাসা ও ভোটারদের আস্থার কারণেই এই বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আফরোজা খানম। তিনি বলেন, মানিকগঞ্জ জেলাকে তিনি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এ জন্য তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

যেভাবে রাজনীতিতে যুক্ত

আফরোজা খানমের বাবা প্রয়াত হারুণার রশিদ খান মুন্নু ছিলেন এই আসনের চারবারের সংসদ সদস্য; মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। মূলত বাবার হাত ধরেই তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী বাবা হারুণার রশিদ খানের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের শুরু আফরোজা খানমের। এরপর জেলা ও রাজধানী ঢাকায় দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের নিয়ে অংশ নেন তিনি। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ (হরিরামপুর ও সিঙ্গাইর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরের বছর ২০১৩ সালে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে ৪৫ কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ ভোটে ৪২ ভোট পেয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। গত ২ ফেব্রুয়ারি আফরোজা খানমকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপির সাত সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যও।