ঢাকায় ঢোকার মুখে ৩টি তল্লাশিচৌকিতে মধ্যরাতে যা হলো
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৫ মিনিট। রাজধানী ঢাকার ধউর বেড়িবাঁধ মোড়ে তল্লাশিচৌকিতে দাঁড়িয়ে আছেন ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য। সবাই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যাত্রীবাহী বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল আসতে দেখলেই দূর থেকে ‘লেজার রশ্মি’ফেলে গতি রোধ করছেন তাঁরা। এরপর গাড়ি থামাতেই চারদিক ঘিরে ধরে শুরু করছেন তল্লাশি।
এর মধ্যেই ‘টি আর ট্রাভেলস’ নামের একটি বাস এসে থামল তল্লাশিচৌকির সামনে। বগুড়ার ঠনঠনিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটি ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল হয়ে যাবে গাবতলীতে। পুরো বাসে ২৫ থেকে ৩০ জন যাত্রী। কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউবা মুঠোফোনে কথা বলছেন। এর মধ্যে বাসে উঠে পড়েন তিন থেকে চারজন পুলিশ সদস্য। ‘নাম কী, যাবেন কোথায়, ব্যাগে কী, পরিচয়পত্র আছে কি না’ ইত্যাদি নানা প্রশ্নে জেরা করতে থাকেন তাঁরা। একপর্যায়ে শুরু করেন মুঠোফোন তল্লাশি। এতে বিরক্ত হয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন কোনো কোনো যাত্রী।
বাসটিতে তল্লাশির সময় কথা হয় রেদোয়ান হাসান নামের এক যাত্রীর সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, ‘পুলিশ গাড়িতে উঠেই আগে মোবাইলটা হাতে নিয়ে নিছে। এরপর ইন্টারনেট চালু করে দিতে বলে। এরপর আমার ফেসবুক আইডিতে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করল। মেসেঞ্জার চেক করল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কিছুই পায়নি। এটা খুবই বিব্রতকর। কিছু বলতে গেলে পুলিশ উল্টো খেপে যায়। আরও বেশি করে জেরা করে। তাই কিছু না বলে চুপ করে বসে ছিলাম।’
ঢাকা-আশুলিয়া ও মিরপুর-আবদুল্লাহপুর সড়ক এসে যুক্ত হয়েছে ধউর বেড়িবাঁধ মোড়ে। প্রায় আধঘণ্টা অবস্থান করে সেখানে পুলিশের এমন তল্লাশি কার্যক্রম দেখা যায়। দুইদিক থেকে কোনো মোটরসাইকেল বা যাত্রীবাহী বাস আসতে দেখলেই তারা গতি রোধ করে তল্লাশি করছিল। কোনো পথচারীর হাতে বড় ব্যাগ দেখলে তাঁকেও তল্লাশি করা হচ্ছিল। যাত্রী-পথচারী সবার ব্যাগই খুলে খুলে তল্লাশি করতে দেখা যায় পুলিশকে।
তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্ব পালন করা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক মো. কামালের সঙ্গে কথা বলেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম। কেউ যাতে নাশকতা করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে এই তৎপরতা।’ মুঠোফোন তল্লাশি বা যাত্রীদের বিরক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণত কারও ফেসবুক বা মেসেঞ্জার ঘাঁটলে বোঝা যায়, সে আসলে কী ধরনের লোক বা কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কি না। তাই তল্লাশির সময় মুঠোফোন চেক করা হয়। এখানে বিরক্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
কামারপাড়া মোড়
ধউর বেড়িবাঁধ থেকে ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক ধরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সামনে এগোলে কামারপাড়া মোড়। এটি রাজধানী ঢাকার আরেকটি প্রবেশদ্বার। গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি শাখা সড়ক এসে যুক্ত হয়েছে এখানে। যে-কেউ চাইলে এই সড়ক হয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় বা ঢাকা থেকে গাজীপুরে যাতায়াত করতে পারবেন। একইভাবে আরেকটি সড়ক গেছে সাভারের আশুলিয়ার দিকে। এই সড়ক ধরেও মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ রাজশাহী বিভাগের মানুষেরা ঢাকায় প্রবেশ করেন।
দিবাগত রাত ১২টার দিকে কামারপাড়া মোড়ে গিয়েও পুলিশের তল্লাশিচৌকি দেখা যায়। দুইদিক থেকে কোনো যানবাহন আসতে দেখলেই পুলিশ সেগুলোর গতি রোধ করছে। যানবাহন থামতেই যাত্রীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন পুলিশ সদস্যরা। তল্লাশি করছেন পুরো গাড়ি। মাঝরাতে পুলিশের এমন তৎপরতা দেখে প্রায় সবাই বিরক্ত। ক্ষোভ ধরে রাখতে না পেরে কেউ কেউ তর্কে জড়িয়ে পড়ছিলেন পুলিশের সঙ্গে।
আশুলিয়ার একটি বায়িং হাউসে চাকরি করেন আনোয়ার হোসেন। কারখানা পরিদর্শন শেষে একটি প্রাইভেট কারে ফিরছিলেন ঢাকায়। দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে তাঁর গাড়িটি কামারপাড়া মোড়ে আসতেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরে পুলিশ। তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর দেহ, ব্যাগসহ পুরো গাড়ি তল্লাশি করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বিরক্ত হয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন পুলিশের সঙ্গে।
তল্লাশিচৌকি থেকে একটু সামনে গিয়ে কথা হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এতটুকু পথ (ধউর বেড়িবাঁধ থেকে কামারপাড়া) আসতে দুইবার পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হইল। পুলিশের তৎপরতা দেখে মনে হয়, দেশে জরুরি অবস্থা চলতাছে। সারা দিন কাজ করে শরীর ক্লান্ত। বারবার বলেছি, আমি কোনো রাজনীতি করি না। আমার সঙ্গে উল্টাপাল্টা কিছু নাই। তারপরও পুরো সব তল্লাশি করছে। কিছুই পায় নাই। এটা অযথাই হয়রানি ছাড়া কিছু না।’
এই মোড়ে তল্লাশির দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. বদরুল হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতেই এই কার্যক্রম। এটা সব সময়ই থাকে। এখানে কাউকে কোনো ধরনের হয়রানি করা হচ্ছে না।’
আবদুল্লাহপুর মোড়
কামারপাড়া মোড় থেকে একই সড়ক ধরে আরও দুই কিলোমিটার সামনে এগোলে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর মোড়। দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকামুখী সড়কের খন্দকার সিএনজি পাম্পের ঠিক সামনে বসেছে পুলিশের তল্লাশিচৌকি। সড়ক ও সড়কের পাশে অবস্থান করছেন ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে যানবাহন বা মোটরসাইকেলের পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া পথচারীদেরও ব্যাপকভাবে তল্লাশি করতে দেখা গেছে তাঁদের। এর মধ্যে কোনো কোনো পথচারী পুলিশের ‘ভয়ে’ হাঁটছিলেন বিকল্প পথে।
টঙ্গী বাজার থেকে হেঁটে আবদুল্লাহপুর পলওয়েল মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন আতাউর রহমান। মধ্যরাতে সড়কে এত পুলিশ দেখে হঠাৎ ভয় পেয়ে যান তিনি। ঝামেলা এড়াতে হাঁটছিলেন একদম সড়কের পাশ ঘেঁষে। সেখানেও তাঁকে দেখে ফেলে পুলিশ। পরে তাঁকে ডেকে এনে তল্লাশি করে পুলিশ। তবে তাঁর কাছে কিছুই পায়নি।
কথা হলে আতাউর বলেন, ‘পুলিশ দেখলে এমনেই ভয় লাগে। তাও এত পুলিশ রাস্তায় দাঁড়ায় আছে, দেখে ভয় পাচ্ছিলাম। তাই সড়কের কিনারা ধরে হাঁটছিলাম। তারপরও স্যাররা ডেকে এনে চেক করছে।’
ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক এসে যুক্ত হয়েছে আবদুল্লাহপুর মোড়ে। এর মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে ঢাকায় প্রবেশ করেন মানুষ।
আবদুল্লাহপুর মোড়ের তল্লাশিচৌকিতে থাকা উত্তরা পূর্ব থানার উপপরিদর্শক সজল পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ মাদক বহন বা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটাতে কোনো পাঁয়তারা করছেন কি না, সেটা দেখার জন্যই আমরা সড়কে অবস্থান করছি। এখানে কারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
ঢাকায় বিএনপির ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন সড়কে তল্লাশিচৌকি বসায় পুলিশ। এতে পথে পথে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।