বাড়িতে ঢুকে তরুণকে গুলি করে হত্যা
নেপথ্যের কারণ ঝুট-ভাঙারির ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি নিয়ে তিন বন্ধুর দ্বন্দ্ব
নরসিংদী শহরের চৌয়ালায় এক তরুণকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সামনে এসেছে টেক্সটাইল শিল্পের ঝুট–ভাঙারির ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্ব। এসবে নেতৃত্ব দেওয়া তিন বন্ধুর সম্পর্কের অবনতির ধারাবাহিকতায় এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে, এমন অভিযোগ নিহত তরুণের পরিবারের সদস্যদের।
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নরসিংদী শহরের চৌয়ালা এলাকায় উত্তর পাড়ায় বাড়িতে ঢুকে আবদুল্লাহ বাবুকে (২৬) গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ওই এলাকার মৃত আবদুল কাদেরের ছেলে। একটি বিদ্যালয়ের সামনে ফুচকা-চটপটি বিক্রি করতেন তিনি।
এ ঘটনায় আজ শনিবার সকালে আবদুল্লাহর বড় ভাই রুবেল মিয়া বাদী হয়ে ১৭ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি শহরের খাটেহারা এলাকার আবু লাল (৪২)। অন্য আসামিরা তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
দুই পক্ষের ঝগড়ার বলি হয়েছে আমার ছোট ছেলে আবদুল্লাহ। স্কুলের সামনে চটপটি-ফুচকা বেচত, কোনো ঝামেলায় সে জড়াত না। হেলাল তার ফুফাতো ভাই। হেলাল ও শফিককে কোপানোর পর কেন ঢাকার হাসপাতালে নিল, সে ক্ষোভ থেকেই আবু লাল আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর আল মামুন জানান, আবদুল্লাহ বাবু হত্যার ঘটনায় আবু লালসহ ১৭ জনের নামোল্লেখ করে মামলা হয়েছে। আসামিরা বর্তমানে এলাকাছাড়া। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান চলছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আবদুল্লাহ গতকাল বিকেল চারটা দিকে ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় পূর্বশত্রুতার জেরে আবু লালের নেতৃত্বে আসামিরা পিস্তল, চাপাতি, রামদাসহ বাড়িতে ঢোকেন। তখন আবদুল্লাহকে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। আবদুল্লাহও ঘরে থাকা হাঁসুয়া দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলে মিরাজ নামের এক হামলাকারী আহত হন। পরেই আবু লাল হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে আবদুল্লাহকে গুলি করেন। একটি গুলি তাঁর বুকে, আরেকটি গুলি হাতে বিদ্ধ হয়। ভাইকে বাঁচাতে গেলে রুবেলকে কুপিয়ে আহত করা হয়। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা চলে যান। এরপর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আবদুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
আজ দুপুরে নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে লাশের অপেক্ষায় বসেছিলেন আবদুল্লাহর মা শায়েরা বেগম, ভাই রুবেলসহ পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা জানান, তিন মাস আগেও আবু লাল, হেলাল ও সনেট খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শিল্পসমৃদ্ধ চৌয়ালা এলাকায় একসঙ্গে ঝুট-ভাঙারির ব্যবসা ও চাঁদাবাজি করতেন। তিন মাস আগে আবু লালের সঙ্গে সনেটের ঝগড়া হয়। এরপর সনেটের ওপর হামলা হয়, ব্যাপক মারধর করা হয় তাঁকে। ওই মারধরের ঘটনায় আবু লালকে আসামি করে মামলা হয়।
ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনে বেরিয়ে আসেন আবু লাল। এরপর থেকে সনেটকে এ এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। সনেটের খালাতো ভাই হওয়ায় হেলালের সঙ্গে আবু লালের সম্পর্কও খারাপ হতে থাকে। সনেটের সঙ্গে হেলালের ছোট ভাই রাকিব চলাফেরা করেন। সনেটকে না পাওয়ার রাগ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাকিবের ওপর হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটে। ভাইয়ের ওপর হামলার চেষ্টার ঘটনায় আবু লালকে কল করে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে যান হেলাল। পরদিন রাতে ঘোড়াশালে হেলালকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোপানো হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকার বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত বৃহস্পতিবার শালিধা এলাকায় হেলালের সৎভাই শফিককে কোপানো হয়। আহত দুজনকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন আবদুল্লাহ বাবু। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল বিকেলে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করেন আবু লাল ও তাঁর অনুসারীরা।
আবদুল্লাহ বাবুর মা শায়েরা বেগম বলেন, ‘দুই পক্ষের ঝগড়ার বলি হয়েছে আমার ছোট ছেলে আবদুল্লাহ। স্কুলের সামনে চটপটি-ফুচকা বেচত, কোনো ঝামেলায় সে জড়াত না। হেলাল তার ফুফাতো ভাই। হেলাল ও শফিককে কোপানোর পর কেন ঢাকার হাসপাতালে নিল, সে ক্ষোভ থেকেই আবু লাল আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে।’
শায়েরা বেগম আরও বলেন, ‘আমার সামনেই আমার ছেলেকে গুলি করেছে আবু লাল। কোমর থেকে পিস্তল বের করার পর আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়েই শরীর দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম, দুই হাত দিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টাও করেছি। কিন্তু সে আমার হাতের নিচে দিয়ে আবদুল্লাহকে গুলি করে দেয়। আবু লাল, তার ভাই আওয়াল ও ভাতিজা হানিফা এই তিনজনকে আমি আটকে ফেলছিলাম। কী করলি রে আবু লাল, তুই কী করলি এটা? আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
এর আগে আজ দুপুর ১২টার দিকে চৌয়ালার উত্তরপাড়া এলাকায় আবদুল্লাহদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ঘর তালাবদ্ধ। মাত্র দুই হাত প্রস্থের একটি গলি, গলির শেষ মাথায় ওই বাড়ি। বাড়ির ফটক এবং গলির বিভিন্ন স্থানে লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।
বাড়িটির আশপাশের ও প্রতিবেশী লোকজন ভয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন না। পাশের বাড়ির এক নারী বলেন, ঘটনার সময় তিনি দাওয়াত খেতে পরিবারসহ অন্যত্র গিয়েছিলেন, তাই কিছুই জানেন না। আরেকজন বলেন, তিনি গতকাল এ এলাকায় ভাড়াটে হিসেবে এসেছেন, কাউকে চেনেন না। আরেক নারী সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই ঘরে ঢুকে যান। এক বৃদ্ধ নারী বলেন, ‘বুঝেনই তো, পরিবার নিয়ে এই এলাকায় থাকতে হবে তো।’
গলি থেকে বের হয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কয়েকজন কিশোরকে। এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলে তারা জানায়, গতকাল তাদের সামনে দিয়েই ১০-১২ জন অস্ত্রশস্ত্রসহ যাচ্ছিল। ভয়ে যে যার মতো দৌড়ে পালায়। পরে জানতে পারে, আবদুল্লাহ বাবুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
স্থানীয় একজন বৃদ্ধ জানান, দুই বছরে শায়েরা বেগমের পরিবারের তিনজন খুন হলেন। দুই বছর আগে তাঁর বড় ভাইকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ছিলেন শায়েরা বেগমের দুই ছেলে মো. হানিফা ও আবদুল্লাহ বাবু। এই হত্যার জের ধরে গত বছর শহরের কাউরিয়া পাড়া ঈদগাহের সামনে গলা কেটে হত্যা করা হয় হানিফাকে। পরে দুই পক্ষই আপস-মীমাংসা করে নেয়। এবার খুন হলেন আবদুল্লাহ বাবু।
স্কুলের সামনে ঢেকে রাখা একটি ভ্যান দেখিয়ে এক মুদিদোকানদার জানান, এই ভ্যানে করেই তিন মাস আগে চটপটি-ফুচকা বিক্রি করতেন আবদুল্লাহ বাবু। হঠাৎ করেই তিনি ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দুই দিন আগেও তাঁর ছোট বোন দোকান খুলেছিল। ব্যবসা বন্ধ করে তিনি হয়তো একটি পক্ষের হয়ে গিয়েছিলেন।
এদিকে আজ বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে আবদুল্লাহ বাবুর লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে হস্তান্তর করা হয়। পরে চৌয়ালায় ঈদগাহ মাঠে তাঁর জানাজা শেষে ঘোষপাড়া কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।