দৌলতপুর উপজেলা প্রতিষ্ঠার চার দশকেও হয়নি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জন্য বরাদ্দ করা জায়গা। গত সোমবার দুপুরে দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের চুয়ামল্লিকপাড়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

কুষ্টিয়া জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা দৌলতপুর। ৪৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এখানে হাটবাজার আছে প্রায় ২৮টি। ছোট-বড় অন্তত পাঁচটি শিল্পকারখানা আছে। এর মধ্যে বড় একটি দিয়াশলাই কারখানা ও বিড়ির কারখানা অন্যতম। এ ছাড়া ১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ১৪টি ও বেসরকারি ক্লিনিক আছে ৬টি। উপজেলাটি প্রতিষ্ঠার চার দশক পরও এখানে হয়নি কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানিয়ে এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। দৌলতপুর উপজেলার কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরে পাশের ভেড়ামারা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন থেকে এসে কর্মীদের আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়। এতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।

দৌলতপুর ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য ১০০ শতক জমির প্রয়োজন। ১১ আগস্ট ৮২ শতক জমির পাশে জেলা প্রশাসনের অর্পিত সম্পত্তি (জমি) থেকে ১৮ শতক জমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

দৌলতপুর শহরের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত উপজেলায় যতজন জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, তাঁরা সবাই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।

কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত গত ৭ মাসে দৌলতপুরে ২০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে ৪৫টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে ৫৬টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪০ লাখ টাকা। আর ২০২৩ সালে ৬০টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

১৯৮৩ সালে দৌলতপুর থানাকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের প্রথম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। সে সময় উপজেলার তারাগুনিয়া কৈপাল এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরে আর কাজ এগোয়নি। এরপর ২০২২ সালে দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের চুয়ামল্লিকপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জন্য ৮২ শতক জমি বরাদ্দ পাওয়া যায়। জমি পাওয়ার পর সেখানে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একটি সাইনবোর্ডও লাগানো হয়। কিন্তু গাড়ি বরাদ্দ না হওয়ায় কার্যক্রম আর শুরু হয়নি। ফলে এ স্টেশনের জন্য নিয়োগ পাওয়া ১৬ জন জেলার বিভিন্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে সংযুক্ত আছেন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বর্তমানে একটি পুকুর আছে। গত সোমবার দুপুরে দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের চুয়ামল্লিকপাড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

গত সোমবার দুপুরে চুয়ামল্লিকপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরের পাশে দুটি খেজুরগাছ। পাশেই একটি সাইনবোর্ড, সেখানে ফায়ার স্টেশনের নির্ধারিত স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুকুরে পানি আছে। পুকুরের চারপাশ ঘাস ও আগাছায় ছেয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা গাছও আছে পুকুরপাড়ে।

কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. ওয়াদুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের নির্ধারিত জমিতে থাকা পুকুর মাটি-বালু দিয়ে ভরাট করতে হবে। ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রকল্প পরিচালকও আছেন। আশা করা যাচ্ছে, খুব দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা হবে।

গত ২ মার্চ রাতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের গরু ব্যবসায়ী রমজান আলীর বসতবাড়িতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজন আগুন নেভানোর পাশাপাশি ভেড়ামারা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ফোন করেন। সেখান থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভানোর আগেই বসতবাড়ির দুটি কক্ষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে তাঁর ব্যাপক ক্ষতি হয়।

জমি-সংক্রান্ত সব জটিলতার অবসান হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করব।
রেজা আহমেদ, সংসদ সদস্য, কুষ্টিয়া-১ আসন

রিফায়েতপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল কাদেরের বাড়িতে গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। সেদিন বেলা ১১টার দিকে টিনের ঘরে আগুন লাগে। প্রতিবেশীরা আগুন নেভাতে না পেরে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসার আগেই সব পুড়ে যায়।

জেলা ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, দৌলতপুর ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য ১০০ শতক জমির প্রয়োজন। ১১ আগস্ট ৮২ শতক জমির পাশে জেলা প্রশাসনের অর্পিত সম্পত্তি (জমি) থেকে ১৮ শতক জমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

অনেক আগেই এখানে ফায়ার স্টেশন হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ (বাচ্চু মোল্লা)। তিনি বলেন, ‘জমি-সংক্রান্ত সব জটিলতার অবসান হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করব।’