এর আগের উপাচার্যের আমলেও পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না করে হীন উদ্দেশে একের পর এক নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। নতুন প্রশাসনও একই পথে হাঁটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, নোবিপ্রবি

সূত্র জানায়, বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে না থাকলেও আকস্মিকভাবে নতুন বিভাগ খোলার বিষয়টি উত্থাপন করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন। নতুন তিনটি বিভাগ হলো পদার্থ, রসায়ন ও মৃত্তিকাবিজ্ঞান। তবে নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক ডাকতে হয় এবং ওই বৈঠকে সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি হিসেবে ‘নতুন বিভাগ খোলা’র বিষয়টি থাকার কথা। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন নতুন বিভাগ খোলার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েকটি যুগোপযোগী বিভাগ খোলার বিষয়ে এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ইউজিসির বক্তব্য হলো, এখানে বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো, বিশেষ করে পদার্থ, রসায়নের মতো বিভাগ নেই। আগে এসব বিভাগ খুলতে হবে। এ কারণে নতুন তিনটি বিভাগ খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউজিসি এসব বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী পদের অনুমোদনও দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তি কমিটির ওই বৈঠকে যখন নতুন বিভাগ খোলার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে, তখন তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিভাগগুলোর শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকদের বসার জায়গা না থাকাসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিভাগ খোলার যৌক্তিকতা নেই বলে মতামত ব্যক্ত করেন অনেক চেয়ারম্যান। কিন্তু উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের চাপে শেষ পর্যন্ত নতুন তিনটি বিভাগ খোলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, পুরোনো বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের বসার জায়গা না করে নতুন বিভাগ খোলার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ হঠকারী। এর আগের উপাচার্যের আমলেও পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না করে হীন উদ্দেশে একের পর এক নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। নতুন প্রশাসনও একই পথে হাঁটছে। অথচ সবার আগে প্রয়োজন ছিল যেসব বিভাগ আছে, সেগুলোর পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা। অনেক বিভাগের ল্যাব নেই। ল্যাবের ব্যবস্থা করা, শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করা—এসব বেশি জরুরি।

সমাজকর্ম, প্রাণিবিদ্যাসহ কয়েকটি বিভাগের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, বিভাগের তিনটি ব্যাচের জন্য তাঁদের শ্রেণিকক্ষ মাত্র একটি। এই এক কক্ষেই তিন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস এমনকি পরীক্ষাও যথাসময়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। এর মধ্যে আবার নতুন আরেকটি ব্যাচের ভর্তিপ্রক্রিয়া চলছে। নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে। এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে গত ১৫ জানুয়ারি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনও করেছেন

সমাজকর্ম, প্রাণিবিদ্যাসহ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গাও নেই বলে জানালেন শিক্ষার্থীরা। এক কক্ষে চার থেকে পাঁচজন শিক্ষককে বসতে হয়। তাই নতুন বিভাগ না খুলে আগের বিভাগগুলোর সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তাঁরা।

হঠাৎ করে নতুন তিন বিভাগ খোলার কারণ জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য মো. দিদার-উল-আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে গেলে তারা অনেকেই বলে, ‘তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে বিজ্ঞানের মূল বিষয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান পড়ানো হয় না।’ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকেও একই কথা বলা হয়েছে। তাই মঞ্জুরি কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী, নতুন তিনটি বিভাগ খোলা হয়েছে। নতুন বিভাগের জন্য শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের বসার জায়গাও ঠিক করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বিভাগগুলোর সংকট প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, বর্তমানে যেসব বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের বসার জায়গার সমস্যা আছে, সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন একাডেমিক ভবন-৩০-এর কয়েকটি কক্ষকে ব্যবহার উপযোগী করার কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই সেগুলোয় পাঠদান করানো হবে।