আজ মহান মে দিবস
ইটভাটায় অনিরাপদ কর্মপরিবেশ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প
হাড়ভাঙা খাটুনি, কম মজুরি, অনিরাপদ পরিবেশ—ইটভাটায় শ্রমিকদের প্রতিদিনের লড়াই। আছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বৈশাখের দুপুর। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য, পাশে চুল্লির গনগনে আগুনের আঁচ। বাতাসে উড়ছে ধুলা আর কয়লার গন্ধ। এমন পরিবেশেই দিন কাটে সুনেত্রা, মালতী, সরলা, শাহিনা, নাসির, শহিদুল ও গোবিন্দদের মতো শ্রমিকদের। তাঁরা ইটভাটার শ্রমিক। তাঁদের প্রতিদিনের সংগ্রাম শ্রমজীবী মানুষের কঠিন বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন আজ। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনে সারা বিশ্বে একযোগে ‘মহান মে দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর দিবসটি আসে, নানা আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয়। কিন্তু ইটভাটার শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো উন্নতি ঘটে না।
ঠাকুরগাঁওয়ে কতটি ইটভাটা চলছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় মোট ১২১টি ইটভাটা আছে। এর মধ্যে ৭৫-৭৬টি চালু আছে। প্রতিটি ইটভাটায় গড়ে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করেন।
গত সোমবার জেলা সদর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কয়েকটি ইটভাটা ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের দীর্ঘ পরিশ্রম, কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প।
‘এ যেন আগুনের ভেতরে বসবাস’
ঠাকুরগাঁও থেকে বালিয়াডাঙ্গী যাওয়ার পথে বারোঢালি গ্রামে কেয়া ব্রিকস নামের একটি ইটভাটায় কাজ করেন সনগাঁও গ্রামের মালতি রানী (৪৮)। ১৫ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। কখনো মাটি কাটেন, কখনো চুল্লি থেকে পোড়া মাটি সরান। দীর্ঘদিন আগুন আর রোদের মধ্যে কাজ করতে করতে তাঁর মুখমণ্ডল কালচে হয়ে গেছে।
প্রথমে কথা বলতে অনীহা জানান তিনি। পরে বলেন, ‘হামার কথা লিখিয়া কী করিবেন?’ বলেই তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুক্ষণ পর কষ্টের কথা বললেন। তাঁর কথায়, ‘জীবন তো শেষ! ভাটার আগুনত পুড়িয়া মেয়েটাক যদি বিহা দিবা পারু, তাতেই শান্তি।’
বালিয়াডাঙ্গী যাওয়ার পথেই পড়ে ভেলাজান গ্রাম। ওই গ্রামের পাশে এসএমবি ইটভাটায় কাজ করেন সরলা রানী (৪৩)। তিনি জানালেন, সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত, কখনো তার বেশি সময় কাজ করতে হয়। একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পান তিনি। আক্ষেপ নিয়ে বললেন, পুরুষেরা ৫০০ টাকা পান, তাঁরা পান ৩০০ টাকা, কেউ কেউ পান ৩৫০ টাকা। মজুরি কম হলেও সব সময় কাজ থাকে বলে ভাটায় পড়ে থাকেন উল্লেখ করে সরলা রানী বলেন, ‘ইটভাটায় কাজ করা আর আগুনে পোড়া একই কথা!’
এসএমবি ইটভাটার পাশেই কাঁচা ইট ও টিন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে ৮-১০ জন শ্রমিক গাদাগাদি করে থাকেন। টিনের ছাউনির ঘরগুলোও উত্তপ্ত—যেন কাজ শেষে আগুনের আঁচ থেকে ফিরে আবার আগুনের আঁচেই বসবাস।
একটি ঘর থেকে ভেসে আসে গান, ‘ওরে জীবন হইলো ইটের ভাটা/ ধিকি ধিকি জ্বলে রে...’। গানটি গাইছিলেন শ্রমিক গোবিন্দ চন্দ্র রায়। গান শেষে তিনি বললেন, ‘চুল্লির তাপ আর টিনের ঘরের গরম মিলাইয়া থাকা যায় না! এ যেন আগুনের ভেতরে বসবাস!’
বরদ্বেশ্বরী গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে কেএম ব্রিকস ইটভাটায় কাজ করেন নাসিরউদ্দিন ও শাহিনা দম্পতি। নীলফামারীর ডোমার থেকে কাজের খোঁজে এখানে এসেছেন তাঁরা। তাঁদের ছেলে রাশেদুল (১১) কাঁচা ইট তৈরিতে মা-বাবাকে সাহায্য করে, আর ছোট মেয়ে রশিদা (৪) ধুলাবালুর মধ্যেই খেলায় মেতে থাকে। শাহিনা বললেন, বাড়িতে দেখার কেউ নেই। তাই ছেলেকে এখানে নিয়ে আসছেন। ভাটা বন্ধ হলেই আবার সে স্কুলে যাবে।
একই কাজ, মজুরি আলাদা
মজুরি নিয়ে বৈষম্য প্রসঙ্গে সরলা রানীর কথার প্রমাণ পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতীয় গবেষণা সংস্থাগুলোর শ্রম সমীক্ষায়। এ সমীক্ষা অনুযায়ী, পুরুষ শ্রমিকেরা সাধারণত দিনে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি পান, অন্যদিকে সমান পরিশ্রম করেও নারী শ্রমিকেরা পান ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।
ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকটি ইটভাটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কাজের ধরন অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি ভিন্ন। মাটি প্রস্তুত করা থেকে প্রতি হাজার কাঁচা ইট তৈরিতে শ্রমিকেরা পান ৭৮০ টাকা। চুল্লিতে ইট সাজানো ও পোড়ানোর পর ইট বের করে রাখার কাজেও প্রতি হাজারে ১৮০ টাকা দেওয়া হয়। আর চুল্লিতে ইট পোড়ানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা দিনে পান ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।
জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সদস্যসচিব হুমাযুন কবির বলেন, শ্রমিকের প্রতি তাঁরা সহানুভূতিশীল। তবে বাজার মন্দার কারণে তাঁদের মজুরি বাড়াতে পারছেন না।
‘তাঁরা অবহেলার শিকার’
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এবং বিশ্বব্যাংকের শ্রম মূল্যায়নবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ইটভাটায় কর্মব্যস্ত মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এই শ্রমশক্তির বড় অংশ নারী ও শিশু, যাঁদের অনেকেই দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ এলাকা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা।
মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন ঠাকুরগাঁওয়ের আইনজীবী জাহিদ ইকবাল। তিনি বললেন, ইটভাটার শ্রমিকদের জীবন অত্যন্ত কষ্টকর। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কম মজুরি—সব মিলিয়ে তাঁরা অবহেলার শিকার। তাঁদের নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়।
ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক রাকিবুল আলমের সঙ্গে। তিনি বললেন, ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকেরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ইটভাটায় দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ইটের গুঁড়া সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সমাজ গবেষক ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে বললেন, মে দিবস শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিকে সামনে আনার দিন। কিন্তু ইটভাটার শ্রমিকদের বাস্তবতা এখনো সেই দাবির অনেক বাইরে। অসহনীয় তাপ, বৈষম্যমূলক মজুরি আর মানবেতর জীবনযাপন নিয়েই তাঁরা প্রতিদিন লড়ছেন।