১১ দলের ‘একক প্রার্থী’ নিয়ে যত আলোচনা

১৯৯১ সালে বিএনপি ও জামায়াত একটি করে আসনে জয় পেয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুটিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার দুটি সংসদীয় আসনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা পথসভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানালেও তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি মাথায় রেখে চলছেন। বর্তমানে তাঁরা দোয়া মাহফিল, পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মোড়কে গণসংযোগ করছেন।

দুটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। একটি আসনে প্রথমে ‘অসন্তোষ’ থাকলেও বিভেদ মিটিয়ে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিও দুটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বিএনপি বাদে এই চার দল ১১–দলীয় জোটে রয়েছে। দুটি আসনেই জোটের পক্ষ থেকে ‘একক প্রার্থী’ দেওয়া হবে বলে আলোচনা আছে। তবে কোন আসনে কোন দল ছাড় পাচ্ছে, তা নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা চলছে।

দুটি আসনেই প্রার্থী হওয়া ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘দলের আমির যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তার ওপর নির্ভর করছে কোন আসন থেকে ভোট করব।’ জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১–দলীয় জোটের একজন প্রার্থী থাকবেন এবং অন্যরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।

অবশ্য জেলা জামায়াতের আমির ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের প্রার্থী মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে যে চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে আমাদের দলের প্রার্থীরাই জোটের প্রার্থী থাকছেন।’

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জেলার একটি করে আসনে জয় পেয়েছিল। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুটিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পান। ২০০৮ সালে দুটি আসনে জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। বর্তমানে দলটির নেতারা আত্মগোপনে। সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকেই বিএনপি ও জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর পক্ষ থেকেও তাঁদের কাছে টানার নীরব প্রতিযোগিতা আছে।

চুয়াডাঙ্গা-১ (আলমডাঙ্গা ও সদরের একাংশ)

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান ও সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মিলিমা ইসলাম বিশ্বাস। শরীফুজ্জামান মনোনয়ন পাওয়ায় দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা অসন্তুষ্ট হন। শামসুজ্জামান ও মিলিমা ইসলামের অনুসারীরা আশায় ছিলেন, যেকোনো সময় প্রার্থী পরিবর্তন করা হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত শরীফুজ্জামানকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করে বিভেদ ভুলে সবাইকে তাঁর পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেয় কেন্দ্র। শামসুজ্জামানকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত করায় স্থানীয় রাজনীতিতেও বরফ গলতে শুরু করে।

মিলিমা ইসলাম স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র তুললেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত সহিদুল ইসলাম বিশ্বাসের মেয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দল যাঁকে যোগ্য মনে করেছে, তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। ধানের শীষের জয় দেখতে মাঠে আছি।’

বিএনপির প্রার্থী মো. শরীফুজ্জামান বলেন, ধানের শীষের পক্ষে বিএনপিতে ঐক্য অটুট। ভোটারদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পিছিয়ে পড়া এ জেলার উন্নয়নে তাঁরা ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চান।

এখানে জামায়াতের জেলার সহকারী সেক্রেটারি মো. মাসুদ পারভেজকে প্রার্থী করেছে দলটি। মাসুদ পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর ভোটের মাঠ পেয়েছি। জামায়াতের পজিটিভ ওয়ার্ক দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আস্থা বাড়িয়েছে। বিশ্বাস করি, অবাধ ভোট হলে জয়লাভ নিশ্চিত।’ 

ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি মো. হাসানুজ্জামান ও সহসভাপতি মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব মোল্লা মো. ফারুক এহসান ও এবি পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন প্রার্থী হয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের দুজনের মধ্যে একজন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে দুজনের মনোনয়নপত্রই বাতিল হবে। বিএনপির বাইরে অন্য দলের সবাই ১১–দলীয় জোটে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যেকোনো একজন প্রার্থী বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদরের একাংশ)

জেলা বিএনপির সভাপতি ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ আসনে বিএনপির প্রার্থী। জামায়াত প্রার্থী করেছে জেলা শাখার আমির মো. রুহুল আমিনকে। তাঁদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন। তাঁরা ছাড়াও এখানে ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি মো. হাসানুজ্জামান, এবি পার্টির জেলা সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. নূর হাকিম প্রার্থী হয়েছেন।

জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান বলেন, নির্বাচিত হলে উন্নয়নবঞ্চিত এ এলাকায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, হাসপাতাল-স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর আধুনিকায়ন করবেন, যাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভোটারদের জেলার বাইরে যেতে না হয়। পাশাপাশি শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করবেন।

জামায়াতের প্রার্থী মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘এবারের নির্বাচন হবে স্মরণকালের সেরা। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা গেছে। তাদের (ভোটারদের) ভাষ্য, অন্যদের দেখা শেষ, এবার জামায়াতকে দেখতে চায়।’