ফুল ভাসিয়ে সুন্দর পৃথিবীর প্রার্থনা

ফুল বিজুতে রাঙামাটি শহরের কেরানি পার্ক এলাকার কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসাতে অনেকেই আসেন দল বেঁধে। গতকাল সকালে
ছবি: সুপ্রিয় চাকমা

প্রকৃতিজুড়ে এখন শেষ চৈত্রের দাবদাহ। তবে এই রুদ্ররূপের আড়ালে পাহাড়ের প্রকৃতি ও মানুষের নতুন জীবনের পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয় এ সময়। চৈত্রের এ সময় জুমখেত তৈরি, কোমরতাঁতে নতুন পিনন, খাদি, ধুতি তৈরির সময়। সব মিলিয়ে এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে উৎসবের জোয়ার। উদ্‌যাপনের রং ছড়িয়ে পড়ে পাড়াগুলোতে। পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু ও সাংক্রান নামে এটিকে সম্বোধন করলেও মূলত নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ারই উৎসব এটি।

গতকাল বুধবার ছিল চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসবের প্রথম দিন ফুল বিজু। এ সময় প্রকৃতিতে ফোটে বিজু ফুল। এই ফুলের সঙ্গে নানান ফুল মিশিয়ে এক ভাগ দিয়ে পূজা করা হয় বুদ্ধের, এক ভাগ দিয়ে সাজানো হয় ঘর; আর অন্য ভাগ নদীতে ভাসিয়ে সুন্দর পৃথিবীর জন্য মঙ্গল কামনা করেন নারী, পুরুষ আর শিশুরা। গতকাল ভোরের আলো ফোটার আগেই ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে ফুল সংগ্রহে। ভোর হওয়ার পর নতুন পোশাক পরে নারী ও শিশুরা নদীতে ফুল ভাসিয়েছেন।

চাকমাদের বিশ্বাস, এ ফুল উপগুপ্ত বুদ্ধের উদ্দেশে ভাসানো হয়। প্রদীপ জ্বালিয়ে আর ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করলে পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে যায়। নতুন বছরে আসে সুখ ও শান্তি। উৎসবটা চাকমা সম্প্রদায়ের হলেও তাঁদের সঙ্গে শামিল হয়েছেন মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিরা। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায়ের বসবাস বেশি বলে সেখানে উৎসবও হয় জমজমাট।

খাগড়াছড়ি জেলা শহরের খবংপুড়িয়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও সকাল সাতটার দিকে ফুল ভাসানো উৎসব শুরু হয়। উৎসবে জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা আর পর্যটকেরাও শামিল হয়েছিলেন।

ফুল আর প্রদীপ জ্বালিয়ে উপগুপ্ত বুদ্ধের উদ্দেশে প্রার্থনা করছেন দুই তরুণী। খাগড়াছড়ির পানছড়ির রাবার ড্যাম এলাকায়। গতকাল সকালে
ছবি: জয়ন্তী দেওয়ান

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়িতে বিজু উৎসব দেখতে এসেছিল পর্যটকদের একটি দল। তাঁদেরই একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদী শিরোপা। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে একবার ফুল ভাসানো উৎসব দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। করোনাসহ বিভিন্ন কারণে আর আসা হয়ে ওঠেনি। এবার এসে আবারও মুগ্ধ হলাম। আগের চেয়ে বেশ জমজমাট।’

খাগড়াছড়ির মতো পানছড়িতেও ভাসানো হয় ফুল। পানছড়ি উপজেলার রাবার ড্যাম এলাকায় চেঙ্গী নদীতে প্রদীপ জ্বালিয়ে ফুল ভাসাতে এসেছিলেন প্রবীণ ব্যক্তি মনতোষ চাকমা। তিনি বলেন, ‘একসময় সন্তানদের নিয়ে ফুল ভাসাতে আসতাম। এখন বয়স বাড়লেও নাতি–নাতনিদের সঙ্গে কষ্ট করে হলেও দূর থেকে এসেছি মনের শান্তির জন্য। এবার উপগুপ্ত বুদ্ধের কাছে প্রাণ ভরে প্রার্থনা করলাম, সবাই মিলেমিশে যেন ভালো থাকতে পারি, পৃথিবীতে যেন শান্তি থাকে।’

রাঙামাটির রাজবন বিহার এলাকার কাপ্তাই হ্রদের তীরে গতকাল সকাল ছয়টায় শুরু হয় ফুল বিজু উৎসব। একই সময় রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি এলাকার কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানো উৎসব আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে জেলার উপজেলাগুলোতেও ফুল ভাসানো উৎসবে যোগ দেন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে বিজু উৎসবের শুরু হলেও মূলত পাহাড়ে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে লোকজ মেলা ও খেলাধুলার আসর। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বৈসাবি উপলক্ষে লোকগান, নাচ, নাটক ও পাজন রান্না প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।

গতকাল ফুল ভাসানো উৎসব শেষে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন বাড়িঘর পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার চাকমা সম্প্রদায়ের মূল বিজুতে অতিথি আপ্যায়ন ও খানাপিনার আয়োজন চলবে। ১৪ এপ্রিল গজ্যাপজ্যা বিজুর দিন কাটবে আলস্যে। সেদিন বৌদ্ধমন্দির ও বিহারে পূজা–অর্চনারও আয়োজন থাকবে।

ফুল বিজুর দিন কথা হয় রাঙামাটি শহরের কেরানি পাহাড় এলাকার তরুণী পূর্ণিমা চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা মিলে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে আগামী দিনের সুখ–শান্তি কামনা করেছি। এখানে হাজার হাজার নারী-পুরুষ উৎসবে যোগ দিয়েছেন।’

রাঙামাটির বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু ও সাংক্রান উৎসব উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এই দিনের বিশেষ তাৎপর্য কী? তিনি বলেন, ‘পুরোনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছর বরণ উপলক্ষে পাহাড়িরা এই উৎসবের আয়োজন করে। দুঃখ, কষ্ট ও গ্লানি ধুয়েমুছে বিদায় দেওয়া ও নতুন বছরে যেন সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা, সবাই এটা চান। এ বছর আমরা সম্মিলিতভাবে ফুল ভাসানোর উৎসব করেছি।’