অভাব ঘোচানোর আশা তাদের 

তাদের জীবনের ধাপে ধাপে এসেছে নানা বাধা। কখনো হোঁচট খেতে হয়েছে। আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। সবকিছু উপেক্ষা করে চালিয়ে গেছে পড়াশোনা। ফলও পেয়েছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় তারা জিপিএ–৫ পেয়েছে। এখন উচ্চশিক্ষিত হয়ে পরিবারের অভাব ঘুচিয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে চায় এই অদম্য মেধাবীরা।

‘তবু মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করিনি’

‘স্বামীর মৃত্যুর পরে তিন মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। তবু মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করিনি। অল্প কিছু জমি থেকে যে সামান্য ধান পাই, তাই দিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। মাঝেমধ্যে আত্মীয়স্বজন খবর নেয়। ছোট মেয়ের পড়ালেখার প্রতি খুবই আগ্রহ। একটু সহযোগিতা পেলে মেয়েটি ভালো করতে পারবে।’

কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের রণতিথা এলাকার বাসিন্দা রাশেদা খাতুন। তাঁর মেয়ে মমতা খাতুন এবারের দাখিল পরীক্ষায় ধানগড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সে। তিন বোনের মধ্যে ছোট মমতা। বড় বোন আমিনা খাতুন স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছেন। মেজ বোন মায়া খাতুন উপজেলা সদর ধানগড়া মহিলা কলেজ থেকে এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। 

ধানগড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, এমন মেধাবী ছাত্রীর পাশে একটু সহায়তার হাত বাড়ালে মেয়েটির স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে। 

‘ছেলেটাক ফির পড়ামো কোনটে থাকি’

উম্মে কুলসুমের দুঃখের সংসারে আনন্দের বার্তা এনেছে ছেলে মেহেদী হাসান। সে এবার এসএসসি পরীক্ষায় রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাংগীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেহেদীর বাবা রুস্তম আলী আগে দিনমজুরি করতেন। ১৩ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণে তিনি এখন কাজ করতে পারেন না। উম্মে কুলসুম অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে ঠিকমতো দুবেলা খাবার জোটে না। ফলে অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়েছে মেহেদীকে। তাদের বাড়ি উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কিসামত মেনানগর মাস্টারপাড়া গ্রামে।

মেহেদী হাসান বলে, ‘অন্যের জমিতে কাজ করে নিজের পড়ার খরচ নিজে জোগিয়েছি। আমরা ইচ্ছা পড়ালেখা করে ডাক্তার হব। মা–বাবার কষ্ট দূর করব। কিন্তু অভাবের সংসারে সেটা কি সম্ভব?’

ডাংগীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, মেহেদী অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় স্কুলের বেতন নেওয়া হয়নি। একটু সহযোগিতা পেলে সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

বাবার সঙ্গে চা বিক্রি করেছে নাইমুর

ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে নাঈমুর রহমান। যার ধারাবাহিকায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে জিপিএ–৫ পেয়েছে। তবে ধারাবাহিক এই সাফল্য ধরে রাখতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নাটোর শহরের উত্তর পটুয়াপাড়া মহল্লার ছেলে নাইমুরকে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা নাছির উদ্দিনের সঙ্গে সপ্তাহে পাঁচ দিন আদালত চত্বরে চা বিক্রি করেছে। করোনার সময় আদালত বন্ধ থাকায় দোকানও বন্ধ ছিল। তখন একবেলা অনাহারে থেকেছে, তবে পড়াশোনা করে সময়টা কাজে লাগিয়েছে।

নাছির উদ্দিন জানান, তাঁর দুটি সন্তান। দুজনই পড়াশোনায় ভালো। অভাবের কারণে বড় ছেলে শিবলী সাদিককে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে পারেননি। শিবলী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ডিপ্লোমা) পড়ছেন। আক্ষেপ ঘোচাতে নাঈমুরকে উচ্চশিক্ষিত করার সংকল্প করেন। চা বিক্রি করে সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে শহরের একটি পুরোনো পোশাক তৈরির দোকানে কাজে লাগান। কিন্তু করোনায় সব ওলট–পালট হয়ে যায়।

পানের বরজে কাজ করেছে মিরা

পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অর্থের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় মিরা মণ্ডলের। মা–বাবার একরকম অবাধ্য হয়েই পানের বরজে কাজ শুরু করে। সেই আয় দিয়ে চলে পড়াশোনা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বরিশালের গৌরনদী উপজেলার চাদশী ঈশ্বরচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সব বিষয়ে জিপিএ–৫ পেয়েছে মিরা। সে উপজেলার উত্তর চাদশী গ্রামের লক্ষ্মণ মণ্ডলের মেয়ে।

পরীক্ষার ফল শুনে খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিরার মা–বাবাসহ স্বজনেরা। ভালো ফলে খুশি হলেও কলেজে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা। মিরার মা সাবিত্রী মণ্ডল বলেন, তাঁর দিনমজুর স্বামীর আয় দিয়ে তিন সন্তানসহ পাঁচজনের সংসার ভালোই চলছিল। ২০১৯ সালে হঠাৎ স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভিটেমাটি বিক্রি করে চিকিৎসা করানো হয়। এখনো তিনি শয্যাশায়ী। তিন বছর আগে অর্থের অভাবে মিরার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁরা। 

মিরা মণ্ডল বলে, ‘যত কষ্ট করতেই হোক না কেন আমি লেখাপড়া করে আমার লক্ষ্যে পৌঁছাব। এ জন্য যদি মানুষের বাড়ি কাজ করতেও হয়, তাতেও আমার আপত্তি নেই। কষ্ট করেই জীবনে দাঁড়াতে চাই। মা–বাবার দুঃখ-কষ্ট ঘোচাতে চাই।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি, নাটোর, তারাগঞ্জ, রংপুর, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ গৌরনদী, বরিশাল]