চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ও গত রোববার চট্টগ্রাম নগরের খুলশী ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে র্যাব। আজ মঙ্গলবার সকালে র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মো. মিজান (৫৩) ও মো. মামুন (৩৮)। তাঁদের মধ্যে মিজান র্যাব কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় করা মামলাটির এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁর বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকায়। গ্রেপ্তার মামুনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। মামুনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে ১৯ জানুয়ারি অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাবের উপসহকারী পরিচালক-ডিএডি (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। হামলায় একই সময়ে তিন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় ২২ জানুয়ারি সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা হয়। এতে মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আসামি করা হয় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাঁদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় র্যাবের আটক করা এক আসামিকে। চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যান আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে।
র্যাব কর্মকর্তা হত্যার মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের সীতাকুণ্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে অবস্থান হলেও এটি অনেকটা নগরের ভেতরেই। এর পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।
জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কয়েক দশক ধরে এটি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, খুনোখুনির ঘটনা ঘটে চলছে। সম্প্রতি এলাকায় দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি হয়। এতে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।
পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। রোকন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত)। র্যাব কর্মকর্তা নিহত ও হামলার পেছনেও সন্ত্রাসীদের এই দুটি পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয় উঠে আসছে। বাসিন্দারা জানান, একটি পক্ষ র্যাবকে ভুল তথ্য দিয়ে আরেক পক্ষকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। র্যাবের তথ্যদাতাকে (সোর্স) এলাকায় দেখেই একটি পক্ষ ইট ছুড়তে থাকে এবং লাঠি নিয়ে হামলা চালায়।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রোকন ও ইয়াসিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দুজনই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করেন।
সম্প্রতি এ ঘটনায় মোহাম্মদ ইয়াসিনের বক্তব্যের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে র্যাবের অভিযানের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সলিমপুরে কোনো অভিযান পরিচালনা না করার জন্য হুঁশিয়ারি দেন ইয়াসিন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের নামে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করতে দেওয়া হবে না। কাউকে ধরতে হলে অভিযানের আগে আসামির নাম-ঠিকানা জানাতে হবে। অন্যথায় সলিমপুরে জনবিস্ফোরণ ঘটবে। এর দায়ভার প্রশাসনকে নিতে হবে।