তরুণ বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ, সতর্ক হোন এখনই
রাকিবের বয়স ২৯ বছর। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হয়। সকালে তাড়াহুড়া করে নাশতা, দুপুরে অফিসের খাবার আর রাতে বাসায় ফিরে ভারী খাবার—এভাবেই চলে তাঁর দিন। নিয়মিত শরীরচর্চার সুযোগ হয় না। সপ্তাহের বেশির ভাগ দিনই অফিস থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায়। ছুটির দিনেও বিশ্রাম নেওয়ার বদলে ঘুম, মুঠোফোন আর অফিসের কিছু বাকি কাজ নিয়েই সময় কাটে।
কয়েক মাস ধরে মাঝেমধ্যে মাথাব্যথা হলেও বিষয়টি গুরুত্ব দেননি রাকিব। একদিন পরিবারের একজনের পরামর্শে রক্তচাপ মাপতে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। চিকিৎসকের পরামর্শে পরবর্তী সময়ে কয়েকবার রক্তচাপ মাপার পর উচ্চ রক্তচাপের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
রাকিবের মতো ঘটনা এখন আর শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বজুড়ে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁদের প্রায় ৪৪ শতাংশ জানতেন না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ফলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না। কারও মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা চোখে ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ হতে পারে। কিন্তু উপসর্গ না থাকলেও দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালির ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তৈরির পেছনে জীবনযাপনের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পারিবারিক ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস ও কিছু হরমোনজনিত সমস্যার মতো শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁদের প্রায় ৪৪ শতাংশ জানতেন না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ফলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে লবণের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৫ গ্রামের কম লবণ গ্রহণের পরামর্শ দেয়। রান্নায় ব্যবহৃত লবণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রবেশ করতে পারে। অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই খাবারে লবণ কমানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারও সীমিত করা প্রয়োজন।
শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাবও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার অভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা না থাকলে ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড অথবা ৭৫ মিনিট বেশি তীব্রতার শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শ দেয়। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করাও উপকারী।
পারিবারিক ইতিহাস থাকলে তরুণ বয়স থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তবে বংশগত ঝুঁকি থাকলেই উচ্চ রক্তচাপ হবে, এমন নয়। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলা এবং অতিরিক্ত মদ্যপান না করা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
তরুণ বয়সে রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। তবে একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলেই উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। রক্তচাপ বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সঠিক পদ্ধতিতে একাধিকবার রক্তচাপ মাপা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ইউরোপীয় হৃদ্রোগ সমিতির নির্দেশিকায় উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে রক্তচাপ পরিমাপের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, দুই ভিন্ন দিনে মাপা রক্তচাপের ক্ষেত্রে ওপরের চাপ ১৪০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি অথবা নিচের চাপ ৯০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা প্রয়োজন কি না এবং কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হবে, তা তাঁর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। খাবারে লবণ কমাতে হবে, শাকসবজি, ফলমূলসহ স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে হবে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ বয়স মানেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করতে পারে। তাই অসুস্থতার অপেক্ষা না করে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা জরুরি। সময়মতো শনাক্ত করা গেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এনে ভবিষ্যতের গুরুতর স্বাস্থ্য।
এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল