রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম দুমদুম্যা ইউনিয়নের গবছড়ি বাজার। স্থানীয় মানুষের জীবিকা, কেনাবেচা আর প্রতিদিনের আড্ডার কেন্দ্র এ বাজার। কিন্তু গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় মুহূর্তের আগুনে পুড়ে যায় বাজারের দোকানপাট ও বসতঘর। পুড়েছে অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন ও স্বপ্ন।
বন্ধের দিনের আগুনে অন্তত ২৬টি দোকান ও ১০টি বসতঘর পুড়ে গেছে। ঘরবাড়ির নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে পুড়েছে শিক্ষার্থীদের নতুন বই, খাতা, স্কুলব্যাগও। পুড়ে ছাই হয়েছে ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন আর আশা-আকাঙ্ক্ষা। আর আগুনে অনেক দোকানি ও পরিবার প্রায় নিঃস্ব হওয়ার পথে। সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা।
চুমাচুমি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রান্তিকা, দীপংকর ও সূর্য চাকমা। এখনো তাদের চোখে-মুখে বই-খাতা হারানোর যন্ত্রণা ভাসছে। চুমাচুমি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুনি শংকর চাকমা বলেন, নতুন বই-খাতা পুড়ে যাওয়ায় ছোট্ট শিক্ষার্থীদের মনে অনেক কষ্ট ছিল। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই ইতিমধ্যে প্রদান করেছে। এমন সময়ে সহায়তা তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে।
এদিকে আগুনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল সোমবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জুরাছড়ি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনপূর্ণ চাকমার নেতৃত্বে ২৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও ৪০টি পরিবারের মধ্যে নগদ অর্থ, কাপড়, চাল, ডাল, তেলসহ ১০ ধরনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বই, খাতা, কলম ও স্কুলব্যাগ। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাসুদ রানা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করার কথা জানান।
ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
গবছড়ি বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি স্থানীয় মানুষের প্রধান আয়ের উৎস। দোকান পুড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন কর্মহীন। কালো কেতু, নিত্য লাল, বিরেজ পুদি চাকমা ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারেরা বলেন, তাঁরা সাত-আট বছর ধরে দোকান করছেন। এক ঘণ্টার আগুনে সব শেষ হয়ে গেছে তাঁদের। পুড়ে গেছে জীবনের সব সঞ্চয়। অগ্নিকাণ্ডের পর অনেক পরিবার আছে ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে, আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছে স্বজনদের বাড়িতে।
স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, সীমান্তবর্তী এই বাজারে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম বা দ্রুত ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। তাঁরা বলছেন, পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত বাজারগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা প্রয়োজন, যাতে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও গবছড়ির মানুষ হাল ছাড়েননি। কেউ ভাঙা টিন সরাচ্ছেন, কেউ দোকানের জায়গা পরিষ্কার করছেন, কেউবা নতুন করে ঘর তোলার স্বপ্ন দেখছেন। শিশুদের হাতে নতুন বই, নতুন খাতা—যেন প্রতীক হয়ে উঠেছে নতুন শুরুর।
জুরাছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো বায়োজীদ বিন আখন্দ বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার ও কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।