মারুফের সেই ‘টিনের চালা’ এখন অসহায়ের আশ্রয়ের ঠিকানা

অসহায় মানুষকে উদ্ধার করে এনে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করেন বদরগঞ্জের মারুফ কেইন। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

যে গল্প একদিন পাঠকের চোখ ভিজিয়েছিল, আজ সেই গল্পই বদলে দিচ্ছে অসহায় মানুষের জীবন। দেশের মানুষের সহমর্মিতা, ভালোবাসা আর নিরন্তর সহায়তায় একসময়ের টিনের চালা আজ দাঁড়িয়ে আছে আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে। মারুফ কেইনের গড়া ‘গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পথের ধারে পড়ে থাকা নাম-পরিচয়হীন মানুষের বেঁচে থাকার নতুন ঠিকানা।

মারুফ কেইনের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার রামদাশ ধনীরামপাড়া গ্রামে। ১৯৯৮ সালে বিএ পাস করেন। ২০০৭ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বেসরকারি চিকিৎসা সংস্থা ‘মিশনারি ল্যাম্ব হাসপাতালে’ চাকরি নেন। চাকরির কাজে তাঁকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছুটতে হতো। অবহেলায় পড়ে থাকা অসুস্থ, অপ্রকৃতিস্থ মানুষ দেখলে তাঁদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন তিনি।

২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে পার্বতীপুর রেলস্টেশন চত্বরে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন মারুফ। তাঁর পা দুটিতে ছিল দগদগে ঘা। পথচারীরা নাকে–মুখে রুমাল চেপে পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করছেন। মারুফ সেই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক শর্ত জুড়ে দেন, ক্ষতস্থান মারুফকেই পরিষ্কার করতে হবে। মারুফ চিকিৎসকের পরামর্শে হাতে গ্লাভস পরে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করেন। ওই হাসপাতালেই মারুফ একাধারে ১০ দিন থেকে তাঁকে কিছুটা সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লোকটিকে বাঁচানো যায়নি।

ওই ঘটনা মারুফকে ব্যাপক নাড়া দেয়। সিদ্ধান্ত নেন, পথে–ঘাটে পড়ে থাকা অসুস্থ ও অপ্রকৃতিস্থ মানুষকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তোলাই হবে তাঁর মূল কাজ। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। ওই বছরের মে মাসে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের হাসিনানগর নামাপাড়া গ্রামে বসতবাড়ি করার জন্য কেনা জমিতে টিনের চালা তৈরি করেন। পথে-ঘাটে পড়ে থাকা অসুস্থ, অপ্রকৃতিস্থ, অসহায় মানুষকে উদ্ধার করে সেখানে এনে রাখেন। নাম দেন ‘গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা।’ ঠিকানাহীন অসহায় মানুষকে এনে শুরু করেন মানবসেবা।

এটা নিয়ে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ ‘মারুফের তুলনাহীন মানবসেবা’ শিরোনামে প্রথম আলোর শেষের পাতায় তাঁর মানবসেবার গল্প প্রকাশিত হয়। তাঁর গড়া সংস্থার ব্যাপারে দেশের মানুষের মায়া, মমতা আর ভালোবাসার ঢেউ উথলে ওঠে। দেশ-বিদেশ থেকে যে যা পারেন, মারুফের কাছে পাঠিয়ে দেন। সংস্থাটি সমাজসেবার অধীনে নিবন্ধন হয়। মানুষের দেওয়া টাকায় মারুফ সংস্থাটির নামে ১৫ শতক জমি কেনেন। তৈরি করেন পাঁচটি পাকা ঘর। তখন থেকেই সংস্থাটি বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় চলছে। বর্তমানে পাঁচটি ঘরে ২৫ জন বয়স্ক মানুষ আছেন। ৪৯ জনকে পরিবারের লোক ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। সংস্থার ঘরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন ৩০ জন।

বদরগঞ্জের হাসিনানগরে ‘গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থার’ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম পরিবেশে গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাঁচটি পাকা ঘর, চারপাশে ফল-ফুলের বাগান—সব মিলিয়ে যেন শান্তির এক আশ্রয়।

বদরগঞ্জের হাসিনানগরে মারুফ কেইনের গড়ে তোলা ‘গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থার’ কার্যালয়
ছবি: প্রথম আলো

মারুফের চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক। প্রথম আলোর পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মারুফ বলছিলেন, এখন আর কোনো কিছুর জন্য চিন্তা করতে হয় না। দেশের মানুষের সাহায্যে পাঁচটি পাকা ঘর, ১৫ শতক জমি হয়েছে। প্রতি মাসে যে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়, তা দেশের হৃদয়বান মানুষেরাই দেন।

সংস্থাটি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পেশার ৩১ সদস্যের একটি কমিটি আছে। কমিটির সভাপতি নিখিল চন্দ্র প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের ৬৯টি পরিবার প্রতি মাসে এক কেজি করে মুষ্টিচাল সংস্থার তহবিলে দিচ্ছে। কমিটির সদস্যরাও সাধ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা করছেন। মারুফ প্রতিষ্ঠানটির নামে ঘরসহ তিন শতক জমি লিখে দিয়েছেন।

জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অনিল চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, মারুফের গড়া ‘গ্লোরি সমাজ উন্নয়ন সংস্থার’ কাজ একেবারে ব্যতিক্রমধর্মী। মারুফও একজন মানবদরদি মানুষ। অসুস্থ মানুষকে তিনি নিজের বাবা-মায়ের মতো সেবাযত্ন করেন। দুস্থ ও পীড়িতদের সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে মারুফকে ২০২৫ সালে পুরস্কৃত করা হয়েছে। ২০১৯ সালে রংপুর ফাউন্ডেশনও তাঁকে পুরস্কার দিয়েছে।

মারুফ কেইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসঙ্গে ২০০ মানুষের সেবা করার স্বপ্ন আছে। স্ত্রী আমাকে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে। দেশের মানুষ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের এই সহযোগিতার কথা সারা জীবন মনে রাখব। যত দিন বেঁচে থাকব অসহায় মানুষের সেবা করব।’