মোহনপুর পর্যটনকেন্দ্র ‘মিনি কক্সবাজার’
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় মোহনপুর গ্রামে মেঘনার বেলভূমিতে গড়ে ওঠা মোহনপুর পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক দিন ধরে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। নারী-পুরুষ, শিশুসহ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের হইচই, কোলাহল ও ছোটাছুটিতে সরগরম ওই এলাকা। মেঘনার বালুময় তীরে মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস মনে করিয়ে দিচ্ছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতকে। এ যেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের এক খণ্ড প্রতিচ্ছবি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ওই পর্যটনকেন্দ্রে অবস্থান করে দেখা যায়, সেখানে হাজারো পর্যটকের মিলনমেলা। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণে পুরো এলাকাটি মুখর। সব বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুদের আনাগোনায় সেখানে বইছে প্রাণের উচ্ছ্বাস। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বালুময় মেঘনার তীরে শরীর গড়াগড়ি দিচ্ছেন। কেউ–বা নদীতে নেমে জলকেলি করছেন। সেলফি তুলেও সময় কাটাচ্ছেন অনেকে। শিশুরা সেখানকার পার্কে দোলনায় মনের আনন্দে দোল খাচ্ছে। রাইডে উঠেও হইহুল্লোড় করছে কিছু শিশু। নারীদের অনেককেই পাশের মার্কেটে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। বিনোদনের এই অনিন্দ্যসুন্দর কেন্দ্রটিতে এসে ক্লান্ত-শ্রান্ত পর্যটকেরা যেন নিরাপদ শান্তির নীড়ে একটু স্বস্তি খুঁজছেন। পর্যটনকেন্দ্রটি যেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের এক টুকরো প্রতিচ্ছবি।
ওই পর্যটনকেন্দ্রের পরিচালক কাজী হাবিবুর রহমান বলেন, ২০২১ সালে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলার মোহনপুর গ্রামের লঞ্চঘাট এলাকায় মেঘনার তীরে পর্যটনকেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। এর মূল স্বপ্নদ্রষ্টা তাঁর বড় ভাই ব্যবসায়ী কাজী মিজানুর রহমান। চাঁদপুর ও আশপাশের জেলার ভ্রমণপিপাসু লোকজনের নির্বিঘ্ন বিনোদনের কথা ভেবে কক্সবাজার সমুদসৈকতের আদলে এটি তৈরি করা হয়। মেঘনার পাড়ে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এ বিনোদনকেন্দ্রটির সৈকতে উন্নত মানের কৃত্রিম বালু বসানো হয়েছে। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার্থে সেখানে একটি ফাইভস্টার রেস্টুরেন্ট ও পাঁচটি ফাইভস্টার মানের কটেজ রয়েছে। রেস্টুরেন্টটিতে একসঙ্গে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ শ পর্যটক খাবার খেতে পারছেন। সেখানে বাংলা, চায়নিজ, ভারতীয়, ইউরোপীয় ও কন্টিনেন্টাল প্রায় সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
১৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি মিলনায়তন রয়েছে। সেখানে একসঙ্গে তিন থেকে চার হাজার লোক সভা করতে পারছেন। এক পাশে করা হয়েছে পর্যটন মার্কেট। পার্কে রাখা হয়েছে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা। পর্যটনকেন্দ্রটি সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছেন ৪০ জন এলিট ফোর্সের সদস্য। রয়েছে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাবলয়। পর্যটনকেন্দ্রটির চারপাশে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে দেয়ালের ওপর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে।
কাজী হাবিবুর আরও বলেন, সাত-আট দিন ধরে প্রতিদিন গড়ে সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার থেকে পাঁচ হাজার পর্যটক আসছেন। সুইজারল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, ভারত ও চীনের কিছু পর্যটকও এসেছেন। প্রত্যেক পর্যটকের প্রবেশ ফি ১০০ টাকা। তবে নিম্ন আয়ের পর্যটকদের জন্য কিছু ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী রাজিব পোদ্দার বলেন, পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই পর্যটনকেন্দ্রে এসেছেন। নদীর তীরে ও পার্কে সময় কাটিয়েছেন। সন্ধ্যার আগে পর্যটনকেন্দ্রটির তীর থেকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখেছেন। অনেক ঘোরাঘুরি করে আনন্দ পেয়েছেন। কোনো সমস্যা হয়নি। নিরাপদে ঘুরতে পেরে ভালো লাগছে। সময় ও অর্থের অভাবে কক্সবাজার যাওয়া হয় না। কক্সবাজারের স্বাদ এখানে পেয়েছেন। এখানে স্বল্প খরচে এত সুন্দর বিনোদনের ব্যবস্থা দেখে আনন্দিত।
মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের শিশু মো. মাশরাফি (৬) বলে, ‘এনো আইয়া অনেক মজা পাইছি। পার্কে খেলছি। অনেক কিছু দেখছি ও খাইছি। খুব ভালা লাগতাছে।’
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শাহজাহান কামাল বলেন, পর্যটনকেন্দ্রটিতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। প্রতিদিন দর্শনার্থীদের আনাগোনা বাড়ছেই। তাঁদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।