ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন পাহাড়ের তিন ঝরনায়
বান্দরবানের রেমাক্রীতে নদী-ঝরনার মিলন দেখার সুযোগ, খাগড়াছড়ির তুয়ারি মাইরাংয়ে ট্রেকিংয়ের হাতছানি এবং রাঙামাটির ছোট সুবলংয়ে নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা হতে পারে পর্যটকদের। তবে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা ও সতর্কতা।
পাহাড়ের বুক চিরে ঝিরঝির শব্দে নেমে আসছে জলরাশি। পাদদেশের স্বচ্ছ জলাশয়ে যেন নীল আকাশ নুয়ে পড়েছে। দূরের বন থেকে থেকে থেকে ডেকে উঠছে পাখি। এমন প্রশান্ত করা দৃশ্যের মাঝে ডুবে যাওয়ার সময় এখন। হাতে আছে ঈদের ছুটির অবসর। সেই অবসরে বেড়িয়ে আসুন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি ঝরনার যেকোনো একটিতে। বান্দরবানের রেমাক্রী ফলস, খাগড়াছড়ির দীঘিনালার তুয়ারি মাইরাং ও রাঙামাটির ছোট সুবলং ঝরনার পর্যটকদের দেবে অন্য রকম প্রশান্তি। তিন ঝরনা নিয়ে লিখেছেন বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, বান্দরবান; জয়ন্তী দেওয়ান, খাগড়াছড়ি ও মিকেল চাকমা, রাঙামাটি।
রেমাক্রী ফলস
থানচি উপজেলায় বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার—এই তিন দেশের সীমানায় পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা রেমাক্রী খাল সাঙ্গু নদে (স্থানীয় নাম শঙ্খ নদ) মিশেছে। খালের মোহনায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল জলপ্রপাত। সেটিই রেমাক্রী ফলস। অপরূপ সুন্দর প্রকৃতি। পাহাড়ের পাদদেশে খাল হয়ে নেমে আসার ভূদৃশ্য যেমন মনোরম, তেমনি মোহনার জলপ্রপাতের দুই পাশে সবুজের সমারোহ ও পাথুরে পাহাড়ের সারি ক্লান্তিহীন সজীব রাখে সবাইকে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারার টুকরা ছবি ঝরনার সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
রেমাক্রী খালের মোহনায় রেমাক্রী ফলস বা জলপ্রপাত থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে সাঙ্গু নদের উজানে। এই রেমাক্রী খালের নামে রেমাক্রী ইউনিয়নের নাম হয়েছে। পূর্বে সীমান্ত পাহাড় এবং পশ্চিম পাশে তাজিংডং ও কেওক্রাডং পাহাড়শ্রেণির পাদদেশে হয়ে নেমে আসা খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। তিন্দু ও রেমাক্রী দুটি ইউনিয়নের সীমানা খালটিতে বহু ঝিরিঝরনা এসে মিশেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের শিহরণ জাগানো পর্যটন গন্তব্য নাফাখুম ঝরনাও রেমাক্রী খালেরই এক অনন্য সৃষ্টি।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে রেমাক্রী ফলসের রূপেরও বদল হয়ে যায়। বসন্তে-গ্রীষ্মে শান্ত-স্নিগ্ধ এক রূপ, বর্ষায় রুদ্রমূর্তির আরেক রূপের সৌন্দর্য এবং শীতে জলধারার সঙ্গে বয়ে চলা অবিরাম হিমশীতল হাওয়া উপভোগ করা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য বসন্ত ও গ্রীষ্মে। অসংখ্য পাথর ভেদ করে আসা রেমাক্রী খালের শীতল জলধারা স্বস্তি দেয়।
রেমাক্রী খালের মোহনায় রেমাক্রী ফলস বা জলপ্রপাত থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে সাঙ্গু নদের উজানে। এই রেমাক্রী খালের নামে রেমাক্রী ইউনিয়নের নাম হয়েছে। পূর্বে সীমান্ত পাহাড় এবং পশ্চিম পাশে তাজিংডং ও কেওক্রাডং পাহাড়শ্রেণির পাদদেশে হয়ে নেমে আসা খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। তিন্দু ও রেমাক্রী দুটি ইউনিয়নের সীমানা খালটিতে বহু ঝিরিঝরনা এসে মিশেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের শিহরণ জাগানো পর্যটন গন্তব্য নাফাখুম ঝরনাও রেমাক্রী খালেরই এক অনন্য সৃষ্টি। খালের মোহনা বা রেমাক্রী ফলস থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার গেলে দতং নামে একটি অপরূপ সুন্দর পাহাড় রয়েছে। এই পাহাড়ে চারদিকে খাড়া পাথুরে দেয়াল। শুধু পশ্চিম পাশে সিঁড়ি স্থাপন করে ওঠার একটি সরু পথ রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ছাড়া বাইরের অধিকাংশ মানুষ দতং পাহাড় সম্পর্কে জানে না। বর্ষকালে দতং পাহাড়ে অপূর্ব সুন্দর কিছু মৌসুমি ঝরনার দেখা মেলে।
একসময় রেমাক্রী ফলস বা জলপ্রপাত এলাকায় কোনো জনবসতি ছিল না। পর্যটকের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি রেমাক্রী বাজার নামের একটি বাজারও গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল, কুটির ও খাবারের দোকান। আবাসিক হোটেল ছাড়াও সেখানে ঘরোয়া পর্যটনও (হোম-স্টে ট্যুরিজম) জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ জন্য প্রতিবছর ঈদের ছুটি ও অন্যান্য ছুটিতে রেমাক্রী ফলস, নাফাখুমের অকৃত্রিম প্রকৃতি দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন।
তবে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো। প্রথমত, আলীকদম-থানচি সড়ক থেকে যেকোনো ধরনের যানবাহনে তিন্দু হয়ে রেমাক্রী ফলসে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আলীকদম-থানচি সড়ক থেকে তিন্দু অভিমুখে যাওয়া খাড়া পাহাড়ি সড়কটি খানাখন্দে ভরা বিপজ্জনক। তবে থানচি উপজেলা সদর থেকে যন্ত্রচালিত নৌকায় নিরাপদে যাওয়া যায়।
তুয়ারি মাইরাং
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার তুয়ারি মাইরাং ঝরনা তুলনামূলক নতুন পর্যটন আকর্ষণ। ত্রিপুরা ভাষায় ‘তুয়ারি মাইরাং’ অর্থ ‘জল রানির প্রকৃতি’। নামের মতোই ঝরনাটি নীরব, শান্ত ও সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু এই ঝরনায় সারা বছরই পানির প্রবাহ থাকে। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা আশপাশের অরণ্যকে করে তোলে সজীব। ঝরনায় পৌঁছাতে হলে প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটতে হয়।
খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের নয় মাইল এলাকা থেকে শুরু হয় ট্রেকিং। পথে দেখা মেলে জুমচাষ, পাহাড়ি বসতি ও সবুজ বনাঞ্চল। এই পথই ভ্রমণের বড় আকর্ষণ। ঝরনার কাছাকাছি পৌঁছালে শোনা যায় পানির শব্দ। সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা সাদা জলধারা। তখন পথের ক্লান্তি আর মনে থাকে না।
ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত করা যায় দীঘিনালার ঐতিহাসিক দিঘি। ১৬৬৫ সালে ত্রিপুরার মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য এটি খনন করেন। এখান থেকেই ‘দীঘিনালা’ নামের উৎপত্তি। থাকার জন্য রয়েছে দীঘিনালা রেস্টহাউস ও স্থানীয় হোটেল। খাবারের জন্য বাসস্টেশন এলাকায় কয়েকটি সাধারণ মানের রেস্তোরাঁ আছে। চাইলে জুমঘরে পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়।
ছোট সুবলং
রাঙামাটির সুবলং ঝরনা বহুদিন ধরেই পরিচিত। এর পাশেই নতুন সংযোজন ছোট সুবলং ঝরনা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। কাপ্তাই হ্রদের বুকে নৌকা ভ্রমণ করে এই ঝরনায় যেতে হয়। রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ। নৌযাত্রা নিজেই এখানে বড় আকর্ষণ।
শুষ্ক মৌসুমে বড় সুবলং ঝরনার পানি কমে যায়। তবে ছোট ঝরনাটিতে কিছুটা পানি থাকে। বর্ষা এলে দুই ঝরনাই ফিরে পায় পূর্ণ যৌবন। তখন পাহাড় বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা চারপাশ ভরিয়ে তোলে। ঝরনার আশপাশে সবুজ পাহাড় আর হ্রদের চর মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি হয়। দিনে ঘুরে ফিরে আসাই এখানে ভালো, কারণ থাকার তেমন ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।