২৩ পৌরসভার একটিরও ভাগাড় নেই, বর্জ্য ফেলা হয় যেখানে–সেখানে 

নাটোরের বনপাড়া পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় এখানে। সম্প্রতি বনপাড়া-হাটিকুমরুল সড়কের পাশেছবি: প্রথম আলো

একটি পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় রাস্তার ধারে। এ কারণে বেশ কয়েকটি গাছ মারা গেছে। আর দুর্গন্ধে তো রাস্তার পাশে দাঁড়ানোর উপায় নেই। আরেকটি পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় নদে। দখল ও দূষণে সেই নদ এখন মৃতপ্রায়।

এভাবে রাজশাহী ও নাটোরের ২৩টি পৌরসভার মধ্যে ২২টির বর্জ্যই ফেলা হয় যেখানে–সেখানে। শুধু রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশনে। ২৩টি পৌরসভার একটিরও নেই নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশন।

রাজশাহীর পুঠিয়া পৌরসভার বর্জ্য একসময় রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পাশে ফেলা হতো। কিছুদিন পরপর সেসব বর্জ্য পুড়িয়ে দেওয়া হতো। এতে রাস্তার পাশে লাগানো গাছ মারা যাওয়ার পর নতুন জায়গায় ফেলা শুরু হয়েছে।

ভুক্তভোগী পৌর এলাকার কানাইপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ও উপজেলার ধোকড়াকুল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক শাখাওয়াত মুন্সী প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভার বর্জ্য নিয়ে কথা বলতে বলতে তাঁরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন। একসময়ের প্রবহমান মুসাখান নদ বর্জ্য ফেলে একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। ঝলমলিয়াহাট ও কলাহাটের বর্জ্যের কারণে তাঁদের মহল্লার লোকজনকে ঘুরে অন্য এলাকা দিয়ে প্রধান সড়কে উঠতে হয়। এ ব্যাপারে তাঁরা বছরখানেক আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)কে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে পুঠিয়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাস প্রথম আলোকে বলেন, ডাম্পিং স্টেশনের কথা শুনলেই কেউ জমি দিতে চায় না। এই জন্য সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও তাঁরা জমির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজশাহীর কাঁকনহাট পৌরসভার বর্জ্য পৌর এলাকার গড়গড়িয়া এলাকায় রাস্তার ধারে ফেলা হয়। স্থানীয় লোকজন বলছেন, দীর্ঘদিন থেকে বর্জ্য ফেলার কারণে দুটি বড় মেহগনিগাছ মারা গেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত রয়েছে। রাস্তার পাশে জমিতে হাসান আলী নামের এক ব্যক্তিকে কাজ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, বাতাস যেদিকে যায়, দুর্গন্ধ সেদিকেই যায়। তখন দাঁড়ানো যায় না।

রাজশাহী ও নাটোরের ২৩টি পৌরসভার মধ্যে ২২টির বর্জ্যই ফেলা হয় যেখানে–সেখানে। শুধু রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশনে। ২৩টি পৌরসভার একটিরও নেই নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশন।

পৌর এলাকার কদমশহর এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন জানান, আগে তাঁদের মহল্লার রাস্তার পাশে বর্জ্য ফেলা হতো। জনগণের জোর প্রতিবাদে তাঁদের মহল্লায় বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়েছে। আবার নতুন করে অন্য জায়গায় ফেলা হচ্ছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ি পৌরসভারও কোনো ভাগাড় নেই। জানতে চাইলে ইউএনও ইসরাত জাহান বলেন, পৌরসভাগুলো অনেক দিন আগে হয়েছে। কিন্তু কেউ ডাম্পিং স্টেশন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনির আসার পর থেকে জমি খুঁজছেন। সুবিধাজনক জমি পেলে কিনে ডাম্পিং স্টেশন করা হবে।

নাটোরের বনপাড়া পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হয় বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের পাশে। সেখানে বর্জ্য ফেলার কারণে রাস্তার পাশের গাছপালা মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাল, খেজুরগাছসহ ছয়টি গাছ ইতিমধ্যে মারা গেছে। তার মধ্যে গাড়ি এসে বর্জ্য ঢালছে।

পৌর প্রশাসক ও বড়াইগ্রামের ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বর্জ্যের কারণে জনদুর্ভোগের কথা স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, সরকার থেকে চিঠি এসেছে। খাস জমি পেলে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে বলা হয়েছে। তাঁরা জমি খুঁজছেন।

রাজশাহীর পুঠিয়া পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে মুসাখান নদে। সম্প্রতি পৌরসভার ঝলমলিয়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় সরকার বিভাগের রাজশাহীর উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার একটি মৌলিক চাহিদা হচ্ছে ডাম্পিং স্টেশনে। তিনি সদ্য এসেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে কোনোটার ভাগাড়ের অনুমোদন আছে কি না। তিনি তাহেরপুর পৌরসভা পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছেন তাদের ভাগাড়ের অনুমোদন আছে, কিন্তু তারা করেনি। এ জন্য তাদের তাগাদা দিয়ে এসেছেন। বাকিগুলো খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন।

আর স্থানীয় সরকার বিভাগের নাটোরের উপপরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ‘আমি মনে করি পৌরসভা হওয়ার আগেই ভাগাড়টা ঠিক করা দরকার। কিন্তু পৌরসভার সব কার্যক্রম চলছে, ভাগাড়টা হচ্ছে না। যেমন যত ভালো বাড়িই হোক, তাতে যদি বাথরুম না থাকে, তাকে ভালো বাড়ি বলা যায় না। এত দিন জনপ্রতিনিধিরা এভাবেই চালিয়েছেন। নাটোরের সদরেরটা বোধ হয় হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ঢাকায় এ ব্যাপারে কথা তুলেছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছে, এগুলো ধাপে ধাপে হবে।