‘আমি কেমন করে বাঁচব রে, আল্লাহ কেন আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়ে গেল। আমি কী দোষ করেছিলাম আল্লাহ। তুমি আমার সাথে কেন এমন করলা?’ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবিতে সাত বছর বয়সী একমাত্র শিশুসন্তান তাজবিদকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন মা ইসরাত জাহান খান।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার দক্ষিণ ভবানীপুর লালমিয়া সড়কে বাবার বাসায় কান্না–আহাজারি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ইসরাত জাহান। তাজবিদ ঢাকার একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। ইসরাত জাহান খান ঢাকা মার্কস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক। তাঁর স্বামী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল বাশার মোহাম্মদ মুসাব্বির বর্তমানে মিসরের একটি জাহাজে কর্মরত।
একমাত্র সন্তান ছাড়াও বাসডুবিতে ইসরাত হারিয়েছেন মা অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী রেহেনা আক্তার (৬১) ও ছোট ভাই জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খানকেও (২৫)। তাঁর পাশে আহাজারি করছিলেন তাঁর ছোট বোন বাসডুবিতে বেঁচে যাওয়া নুসরাত জাহান খান।
ঈদের ছুটি শেষে গতকাল বুধবার বিকেলে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাসে ঢাকার মিরপুরের বাসার উদ্দেশে রওনা করেন রেহেনা আক্তার। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন একমাত্র ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, ছোট মেয়ে নুসরাত জাহান খান ও বড় মেয়ে ইসরাত জাহান খানের একমাত্র সন্তান তাজবিদ।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া নুসরাত জাহান খান জানান, বাসে মায়ের পাশে বসে ছিলেন তিনি। আরেক আসনে ভাই আহনাফ তাহমিদের পাশে বসেছিল ভাগনে তাজবিদ। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে বাসের জানালা ভেঙে প্রথমে তিনি বের হন। এরপর মাকে বের করেন। কিন্তু ছোট ভাই আহনাফ ও ভাগনে তাজবিদকে বের করতে পারেননি।
নুসরাতের বড় মামা সরকারি গোয়ালন্দ কামরুল ইসলাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষক আউয়াল আনোয়ার বলেন, ভাগনি নুসরাত দুর্ঘটনার স্মৃতি ভুলতে পারছেন না। মাঝেমধ্যে জেগে উঠলে কিছু ঘটনা বলছেন, আবার একা একা নিশ্চুপ হয়ে পড়ছেন। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথমে তিনি জানালা ভেঙে বের হওয়ার পর তাঁর মাকেও বের করেন। এ সময় তাঁর হাতের কিছু অংশ কেটে যায়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় নৌকায় উঠে আসেন। কিন্তু ছোট ভাই আহনাফ ও ভাগনে তাজবিদকে উদ্ধার করতে পারেনি। মাকে দ্রুত ভ্যানে করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
আউয়াল আনোয়ার আরও বলেন, মাত্র চার মাস আগে নুসরাতের বাবা ইসমাঈল হোসেন খান দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর চার মাসের মাথায় স্ত্রী রেহেনা আক্তার, একমাত্র ছেলে আহনাফ তাহমিদ খানও মারা গেলেন। এখন শুধু বেঁচে আছেন দুই মেয়ে। ঈদের এক দিন পর বোন, ভাগনে, ভাগনি, নাতিসহ সবাই তাঁর গোয়ালন্দের বাসায় বেড়াতে আসেন। কত আনন্দ, হাসি আর আড্ডায় সময় পার করেন। এখন সবই শুধু স্মৃতি। তিনি নিজেও এই স্মৃতি ভুলতে পারছেন না।
আজ বেলা ১১টায় ভবানীপুর লালমিয়া সড়কের বাড়ির সামনে রেহেনা আক্তার, ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান ও শিশু তাজবিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে ভবানীপুর কবরস্থানে রেহেনা আক্তারের দাফন সম্পন্ন হয়। আহনাফের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা এসে জানাজা ধরতে না পারায় তাঁদের জন্য বেলা সাড়ে ১১টায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পাশাপাশি কবরে তিনজনকে দাফন করা হয়।
আহনাফের জানাজায় অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে তাঁরা একত্রে থাকতেন। আহনাফ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তহল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তাঁরা এমন একজন বন্ধুকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলবেন, মেনে নিতে পারছেন না।