সংরক্ষিত বনে উজাড় হচ্ছে হাতির খাবারের উৎস বাঁশবাগান
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি সংরক্ষিত বনের প্রায় ৮ একরের একটি বাঁশবাগানের একাংশ উজাড় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় লোকজনের দাবি, এটি বন্য হাতির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎস। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাঁশবাগান ধ্বংস হলে হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসবে। এতে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়বে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনে অবস্থিত বাঁশবাগান উজাড় হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান, বাগানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্য হাতির নিয়মিত খাদ্য সংগ্রহের অন্যতম স্থান। বাঁশবাগান উজাড়ের কারণে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও খাদ্য সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বন গবেষক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
লোহাগাড়া উপজেলা সদর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে চুনতি হাজী রাস্তার মাথা এলাকা। সেখান থেকে গ্রামীণ সড়ক ধরে কয়েক কিলোমিটার গেলে নয়াপাড়া এলাকায় একটি টিলা চোখে পড়বে। সেখানেই বাঁশবাগানটির অবস্থান। এলাকাবাসীর কাছে এটি বাঁশবাগান পাহাড় নামে পরিচিত। বাঁশঝাড়ের কারণেই পাহাড়টির এমন নাম হয়েছে। প্রায় ৮ একর আয়তনের পাহাড়িটির বাঁশ কাটছে একটি সিন্ডিকেট।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৮ একর আয়তনের পাহাড়টির বেশির ভাগ অংশ এখনো বাঁশঝাড়, বনজ গাছপালা, গুল্ম ও লতাপাতায় ঢাকা। পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে প্রায় এক একর জায়গা উজাড় করে পরিষ্কার করা হয়েছে। উজাড়ের পর এসব গাছপালা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ দেখা গেছে। স্থানীয় লোকজন জানান, তিন দিন আগেও ওই পাহাড়ে কচি বাঁশ খেতে এসেছিল বুনো হাতির দল। জায়গাটি হাতির কাছে খুব প্রিয়।
বনের একাংশে বাঁশ ও গাছ কেটে ফেলার চিহ্ন স্পষ্ট রয়ে গেছে এখনো। কোথাও বাঁশ গোড়াসহ তুলে নেওয়ায় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও আবার কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ির নিচের অংশ রয়ে গেছে। বন থেকে গাচ কাটার দৃশ্য পরিষ্কার দেখা গেছে ড্রোন দিয়ে তোলা ছবি থেকেও।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় পুরো বনটি বাঁশঝাড়ে পরিপূর্ণ ছিল। তিন বছর আগে থেকে ধীরে ধীরে এসব বাঁশঝাড় উজাড় করে বনজ গাছ রোপণ করা হয়। বর্তমানে যে অংশটি উজাড় করা হচ্ছে সেখানে বাঁশঝাড় ছিল। সেসব কেটে গাড়ি ভর্তি করে অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। কেটে ফেলা অংশের সঙ্গে লাগোয়া জায়গায় এখনো অনেক বাঁশঝাড় আছে। সামনে এগুলোও উজাড় হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
তিনজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয় প্রথম আলোর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ‘স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালামের নেতৃত্বে প্রায় আট সদস্যের একটি সিন্ডিকেট বাগানটি উজাড় করছেন। গত রোববার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে বাগানের একাংশ উজাড় করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো বাগানটি উজাড় করে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ রোপণ করার পরিকল্পনা আছে সিন্ডিকেটটির।’
প্রায় ৮ একর আয়তনের পাহাড়টির বেশির ভাগ অংশ এখনো বাঁশঝাড়, বনজ গাছপালা, গুল্ম ও লতাপাতায় ঢাকা। পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে প্রায় এক একর জায়গা উজাড় করে পরিষ্কার করা হয়েছে। উজাড়ের পর এসব গাছপালা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ দেখা গেছে। স্থানীয় লোকজন জানান, তিন দিন আগেও ওই পাহাড়ে কচি বাঁশ খেতে এসেছিল বুনো হাতির দল। জায়গাটি হাতির কাছে খুব প্রিয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জায়গাটি চেনেন না এবং সেটি তার এলাকায় নয় বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
বন গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাঁশ হাতির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের বাঁশবাগান উজাড় হলে হাতি খাদ্যের সন্ধানে লোকালয় ও মানুষের কৃষি জমিতে ঢুকে পড়বে। এতে হাতি-মানুষ সংঘাত আরও বাড়বে।
বাঁশবাগান পাহাড়টি চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের অধীনে। ওই বিটের বিট কর্মকর্তা বজলুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই পাহাড়ে বন বিভাগ ২০০৪ সালে বাঁশ বাগান তৈরি করেছিল। আমি এখানে যোগদান করেছি ২ মাস আগে। দীর্ঘ সময় সময় ধরে যারা বাঁশ বাগান উজাড় করে বাণিজ্যিক বাগান সৃজন করছে তাদের ব্যাপারে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কিনা সেই ব্যাপারে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। এখন আমরা অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাগানো গাছগুলো উচ্ছেদ করব এবং সেখানে পুনরায় বাঁশ রোপণ করে বাগানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব। একই সঙ্গে উজাড় কাজে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেব।’