ফরিদপুরে দুই ভাইকে কুপিয়ে জখম, একজনের হাত-পা ‘প্রায় বিচ্ছিন্ন’

হামলার শিকার দুই ভাইয়ের মায়ের আহাজারি। শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের সামনেছবি: সংগৃহীত

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পূর্ববিরোধের জের ধরে দুই ভাইকে কুপিয়ে জখম করেছে প্রতিপক্ষ। তাঁদের মধ্যে একজনের হাত ও পা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহত ব্যক্তিরা হলেন ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মৃত ধলা মুন্সীর দুই ছেলে হায়দার মুন্সী (৪৬) ও সুজন মুন্সী (৩১)। তাঁরা দুজনেই পেশায় রাজমিস্ত্রি। এর মধ্যে হায়দারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামের কালাম মন্ডল (৩৮) ও সুজন মুন্সীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। গতকাল বিকেলে ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামের বৈশাখী মেলায় দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এর জের ধরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাড়ির সামনে ওত পেতে থাকা কালাম মন্ডল (৩৮), সাত্তার মন্ডল (৩২), শাহ বরাত মন্ডলসহ একদল দুর্বৃত্ত সুজন মুন্সীর ওপর হামলা চালান। তাঁরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুজনের বাঁ হাতের কবজির ওপর কোপ দেন।

কিছুক্ষণ পর সুজনের বড় ভাই হায়দার মুন্সীও একই পথ দিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় তাঁর ওপরও হামলা চালানো হয়। জীবন বাঁচাতে হায়দার পাশের হালিম ফকিরের রান্নাঘরে আশ্রয় নিলে দুর্বৃত্তরা সেখানে ঢুকে তাঁকে কুপিয়ে জখম করেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হায়দারের ডান পা ও ডান হাত এবং বাঁ হাতের কবজিতে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। আহত দুই ভাইকে প্রথমে চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আহত দুই ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানকারী চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘হায়দারের তিন হাত-পায়েই জখম আছে। তাঁর ডান পা ও ডান হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আমরা ফরিদপুরে পাঠিয়েছি।’

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রমা বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. রশিদ জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে হায়দার মুন্সীর অবস্থা সংকটাপন্ন। তাঁর দুটি হাত ও একটি পায়ে গুরুতর জখম রয়েছে। তাঁর মধ্যে একটি হাত ও একটি পা প্রায় বিচ্ছিন্ন বলা যায়। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গতকাল দিবাগত রাতেই ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপর ভাই সুজন বর্তমানে এই ট্রমা সেন্টারে ভর্তি রয়েছেন।

হামলার কারণ হিসেবে আহত সুজন মুন্সী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিন বছর আগে আমার ভাইয়ের সামনে আমাদের গ্রামের রিপন খাঁ ও কালাম মন্ডলের মধ্যে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মামলায় আমার ভাই সাক্ষী দেওয়ার জন্য আসামির কিছু হয়নি। ওই সময় থেকেই কালামের ক্ষোভ, আমার ভাই সাক্ষী দিল কেন। সেই কারণে আমার ভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। আমি জানতে পেরে দৌড়ে গেলে প্রথমে আমাকে রামদা দিয়ে কোপ দেয়। এরপর আমার ভাইকে কোপানো শুরু করে। আমার ভাই দৌড়ে একটি বাড়িতে গিয়ে পালালেও সেখান থেকে বের করে কুপিয়ে মারত্মকভাবে আহত করা হয়।’

ঘটনার বিষয়ে চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. বাবুল মোল্লা জানান, দুই পক্ষই এলাকায় দুষ্ট প্রকৃতির লোক হিসেবে চিহ্নিত। তবে গ্রামে কালাম মন্ডল ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে অপকর্মের অভিযোগ একটু বেশি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এদের কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, আবার কেউ প্রবাসী। এলাকায় এসে মাদকসহ নানান অপকর্মে জড়িয়ে নিজেদের মধ্যকার আগের গ্যাঞ্জামের জের ধরে এত বড় অঘটন ঘটিয়েছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত কালাম মন্ডল, সাত্তার মন্ডল ও শাহ বরাত মন্ডলের কাউকেই পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকায় তাঁদের মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে। আহত দুজনের মা নিরু বেগম (৬৪) বলেন, ‘আমার ছেলে দুইটা নিরীহ ছেলে। ওরা কাজ করে ভাত খায়। ওদের ওপর হামলা করে যারা হাত-পা কেটে ফেলেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’

চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। এ ঘটনায় হায়দারের মা নিরু বেগম বাদী হয়ে কালাম মন্ডল, সাত্তার মন্ডল ও শাহ বরাতের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে গতকাল রাতেই একটি মামলা করেছেন। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।