‘ছাওলডার মুখি আব্বা ডাকডা শুনি, এইডাই আমার আনন্দ’

আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর তীরে বাবা আলাউল ইসলাম নৌকার পাটাতন ঠিক করছেন। পাশের আরেকটি নৌকায় বসে আছে শিশু সিয়াম। ১ জানুয়ারি খুলনার কয়রা উপজেলার গোলখালী গ্রামেছবি : প্রথম আলো

খুলনার কয়রা উপজেলার সর্বদক্ষিণের গ্রাম গোলখালী। এই গ্রামের পর আর কোনো মানববসতি নেই। শেষ ঘরটুকু পেরোলেই আড়পাঙ্গাসিয়া নদী, আর নদীর ওপারে শুরু সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অরণ্য। নদী, বন ও বেড়িবাঁধ—এই তিনের মাঝখানেই এখানকার মানুষের জীবন।

১ জানুয়ারি পৌষের দুপুরে আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর তীরের বেড়িবাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখ আটকে যায় নদীর চরে রাখা একটি নৌকার দিকে। নৌকার ওপর বসে আছে একটি শিশু। প্রথম দেখায় তাকে অন্য রকম মনে হয়। একটু ভালো করে তাকাতেই বোঝা যায়—শিশুটির দুই হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ নেই। একটি পায়ের পাতা ঊরুর সঙ্গে লাগানো। সে নৌকায় বসে আছে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে।

কাছে গিয়ে কথা বলে জানা গেল, শিশুটির নাম সিয়াম হোসেন। বয়স সাত বছর। পাশের আরেকটি নৌকার পাটাতন ঠিক করছেন সিয়ামের বাবা আলাউল ইসলাম। শিশুটি চুপচাপ তাকিয়ে সেই কাজ দেখছে যেন এই শব্দ, এই দৃশ্য তার খুব পরিচিত।
কাজ থামিয়ে আলাউল বলেন, ‘জন্ম থেকেই ছাওলডা (ছেলেটা) এমন। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতি পারে না, দুই হাতও নেই। জন্ম থেইকে এইরম হওয়ায় কোনো চিকিৎসাও নেই। বাবা হইয়ে এইডা মাইনে নেওয়া ছাড়া আমার আর কী করনের আছে? তবু ছাওলডার মুখি আব্বা ডাকডা শুনি, এইডাই আমার আনন্দ।’

সিয়াম স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। মাটিতে বসে এক পায়ে ভর করে শরীর ঠেলে ঠেলে চলে। তবু সে নিয়মিত যায় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আলাউল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছাওলডার ব্রেনডা (মেধা) খুব ভালো। একবার পড়া শুনলিই মুখস্থ হইয়ে যায়। আল্লাহ হাত-পা ভালো না দিলিও ওর ব্রেনডা ভালো দিছে।’

বাবা যখন নৌকা সারান, সিয়াম তখন পাশে এসে বসে। মন দিয়ে বাবার কাজ দেখে। আজও সে একাই বাড়ি থেকে নদীর চরে এসেছে। নৌকার ওপর উঠেছে বুক আর হাতের ওপরের অংশে ভর করে। আবার একাই নামতেও পারবে সেখান থেকে।

সিয়ামের বাবা আলাউল ইসলামের জীবিকা সুন্দরবনে। কখনো মাছ ধরেন, কখনো কাঁকড়া শিকার করেন। নৌকা আর জাল—সবই তাঁর নিজের। বেড়িবাঁধের পাশে সামান্য জমির ওপর তাঁর ঘর। এটুকু ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। তবু তাঁর কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ নেই। আলাউল বলেন, ‘আমি চাইনে কেউ আমার ছাওলডারে দেইখে করুণা করুক। সাহায্যের নামে কেউ আমাগেরে কিছু দিতি চাইলে সেইডাও নেব না।’

কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান আলাউল ইসলাম। সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমার ছাওলডা ঘরে আইসে বলে-মা, ভাত খাব, আব্বা, গোসল করব। এই ডাকই আমাগের সব কষ্ট ভুলাই দেয়। আমি শুধু আল্লাহর কাছে একটা জিনিস চাই—আমার শরীলডা যেন সুস্থ রাখে। গায়ে খাইটে ছাওলডার জন্য এমন কিছু করতি পারি, যেন ভবিষ্যতে ওকে কারও কাছে হাত পাততি না হয়।’

আড়পাঙ্গাসিয়া নদীতে তখন জোয়ারের পানি আসতে শুরু করেছে। নৌকার ওপর বসে সিয়াম বাবার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার কোনো অভিযোগ নেই। তার পাশে আছেন এমন এক বাবা, যাঁর কাছে সন্তানের অক্ষমতা কোনো বোঝা নয়; বরং সন্তান থাকাটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের।