‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে আলোচনার মধ্যে দুই শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি, নেপথ্যে কী

ময়মনসিংহ সদর ও নান্দাইল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে হঠাৎ রদবদল ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ‘ঘুষ.সাইট’–কাণ্ড এবং অনিয়মের অভিযোগের পর এই বদলি কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তবে শিক্ষা বিভাগ বলছে, এই বদলি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ারই অংশ।

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পেনশনের টাকা তুলতে এবং নিজের পাসপোর্ট করতে গিয়ে বারবার ঘুষের দাবির মুখে পড়ে শাহেদ শরীফ আহমেদ নামের এক কিশোর। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সে সম্প্রতি ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে।

আরও পড়ুন

শাহেদ শরীফ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে। এ লেভেলের শিক্ষার্থী। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।

‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির নেপথ্যের কারণ নিয়ে প্রথম আলোতে খবর প্রকাশের পর গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

কমিটির প্রধান ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ আজ শনিবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যথাযথভাবে তদন্ত শেষে ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তবে তদন্তে কী পেয়েছি বা কী সুপারিশ করেছি, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

এর মধ্যে গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় এবং সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে নান্দাইলে বদলি করা হয়। চিঠিতে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন তাঁরা।

বদলির বিষয়ে জানতে আজ শনিবার বিকেলে কয়েক দফা ফোন করা হলেও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন ফোন ধরেননি। তিনি ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে ময়মনসিংহ সদরে যোগ দিয়েছিলেন।

সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা বদলির বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে আজ সন্ধ্যায় ঘুষ.সাইটের নির্মাতা শাহেদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বদলি হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অভিযোগও ছিল না। তিনি যদি শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে সিদ্ধান্তটি মানা যায়। আর যদি কিছু না করে থাকেন, তাহলে এটি যৌক্তিক নয়। যাঁরা প্রকৃত অপরাধী, তাঁরা যদি এখনো স্ব স্ব পদে বহাল থাকে, তবে সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

ঘুষ.সাইট–এর নির্মাতা শাহেদ শরীফ
ছবি: প্রথম আলো

অপর দিকে ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন ফজিলাতুন নেছা। গত ২৪ জুন উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত ও সংস্কারের বরাদ্দ থেকে সিসি ক্যামেরা কেনার নামে টাকা উত্তোলন ও বিদ্যালয় থেকে অর্থ আদায়, নির্বাচন কমিশন থেকে সিসি ক্যামেরার জন্য বরাদ্দ আসার পরও আগের টাকা নিয়ে অনিয়ম, উপজেলা শিক্ষা অফিসের জন্য আসবাব কেনার বরাদ্দের টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করা এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে টাকা নেওয়া।

এ ছাড়া বদলি নীতিমালা অনুসরণ না করে শিক্ষক বদলি ও রিলিজ, নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি, শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষে এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র) লাগানো, কর্মস্থলে অবস্থান না করে ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করে অফিস করা এবং উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিয়োগ না দিয়েই আউটসোর্সিং কর্মীদের বিল উত্তোলনেরও অভিযোগ ছিল ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মজিব আলম ২ সেপ্টেম্বর সরেজমিন তদন্ত করেন।

সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ময়মনসিংহে প্রায় চার বছর ধরে চাকরি করছেন। সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে নান্দাইল থেকে যিনি ময়মনসিংহ সদরে এসেছেন, তিনি প্রায় এক মাস আগে ময়মনসিংহে বদলির জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুজনের কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মো. শফিকুল ইসলাম, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, ময়মনসিংহ জেলা

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফজিলাতুন নেছা বলেন, একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রায় দেড় মাস আগে বদলির জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁর আবেদনে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় বদলির কথা উল্লেখ ছিল। তবে নতুন কর্মস্থলে এখনো যোগ দেননি তিনি। অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ফজিলাতুন নেছা বলেন, বেনামি অভিযোগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। এর সঙ্গে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই।

দুই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বদলির আদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে হয়েছে। জেলা কার্যালয় থেকে এই বদলি করা হয়নি। তাই কী কারণে বদলি করা হয়েছে, তা অধিদপ্তর থেকেই জানা যাবে। তিনি বলেন, সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ময়মনসিংহে প্রায় চার বছর ধরে চাকরি করছেন। সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে নান্দাইল থেকে যিনি ময়মনসিংহ সদরে এসেছেন, তিনি প্রায় এক মাস আগে ময়মনসিংহে বদলির জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুজনের কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে ঘটনা বা এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের কারণে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে কি না—এমনটি মনে করেন না শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ওই কারণে বদলি করা হলে তাঁকে আরও দূরে দেওয়া হতো বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।’

‘ঘুষ.সাইট’–সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে কোনো আবেদনই করেননি। গত মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো আবেদন জমা পড়েনি। কল্যাণ ট্রাস্টের টাকার জন্য আবেদনই যদি না করা হয়ে থাকে, তাহলে ঘুষ চাইবে কে, নেবে কে?