পায়ে মাড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছিল সেমাইয়ের খামির, টয়লেটের পাশে সংরক্ষণ
পায়ে মাড়ানো খামির, নোংরা পরিবেশ আর পোড়া তেলেই তৈরি হচ্ছে উৎসবের অন্যতম খাদ্য উপাদান সেমাই। কোথাও কোথাও এসব আবার সংরক্ষণ করা হয়েছে কারখানার টয়লেটের পাশের জায়গার মতো অপরিচ্ছন্ন স্থানে। এই চিত্র বগুড়ার অনেক সেমাই কারখানার। এসব কারখানায় প্রতিবছর ঈদের আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা করার পাশাপাশি সতর্কবার্তা জানায় প্রশাসন। তবু অবস্থার পরিবর্তন নেই।
ঈদ সামনে রেখে বগুড়ার সেমাই কারখানাগুলোতে সেমাই তৈরির তোড়জোড় শুরু হয় কয়েক মাস আগে থেকেই। এখানে তৈরি লাচ্ছা ও চিকন সেমাই দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে লাচ্ছা সেমাই কারখানাগুলোর বেশির ভাগই জেলার কাহালু উপজেলায়। এখানকার শেখাহার বাজার এলাকায় রয়েছে শতাধিক লাচ্ছা সেমাইয়ের কারখানা। ‘লাচ্ছাপল্লি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এলাকাটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার শেখাহার লাচ্ছাপল্লি ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে লাচ্ছা কারখানাগুলোতে উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ চলছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পুরো মৌসুমে এখানে কয়েক হাজার টন লাচ্ছা সেমাই তৈরি হয়, এর বাজারমূল্য ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা। দেশের নামিদামি অনেক খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখান থেকে লাচ্ছা সেমাই কিনে নিজস্ব প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করে। যদিও এখানকার বেশির ভাগ কারখানার বিএসটিআইয়ের (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) অনুমোদন নেই।
শেখাহারের সবচেয়ে বড় ‘ভাই ভাই’ লাচ্ছা সেমাই কারখানা। ওই কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, খামির তৈরি থেকে উৎপাদন ও প্যাকেজিং পর্যন্ত বহু কারিগর ও শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিকদের কারও কারও মুখে মাস্ক থাকলেও হাতে দস্তানা (গ্লাভস) নেই। কারিগরদের গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম পড়ছে। খামিরে ভনভন করছে মাছি। দেখা গেল পাকা মেঝের ওপর ময়দা ঢেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে খামির করছিলেন কয়েক শ্রমিক। এমনকি মেঝের ওপর একটি পলিথিনও বিছানো হয়নি। উৎপাদিত সেমাই টয়লেটের পাশে দুর্গন্ধময় জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা সেমাই তৈরির দায়ে প্রতিবছর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ভাই ভাই লাচ্ছা কারখানার মালিককে অর্থদণ্ড করা হয়; কিন্তু তাতে টনক নড়ে না কারখানামালিকের।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার শেখাহার সেমাইপল্লিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র্যাব ও জেলা পুলিশ সমন্বিতভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযানে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন, উৎপাদিত সেমাই টয়লেটের পাশে দুর্গন্ধময় স্থানে সংরক্ষণ এবং লাচ্ছা ভাজায় পোড়া তেল ব্যবহার করায় ভাই ভাই লাচ্ছা সেমাই কারখানার মালিক সাজ্জাদ হোসেনকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান এবং নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. রাসেল। মেহেদী হাসান বলেন, শেখাহারে ভাই ভাই লাচ্ছা কারখানায় অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, পায়ে মাড়িয়ে খামির তৈরি করা হচ্ছিল। লাচ্ছা তৈরিতে পোড়া তেল ব্যবহার করা হচ্ছিল। কারখানার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা। উৎপাদিত লাচ্ছা টয়লেটের পাশে দুর্গন্ধময় স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
সেমাই কারখানার এমন পরিবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে ভাই ভাই লাচ্ছা সেমাই কারখানার মালিক সাজ্জাদ হোসেন দাবি করেন, তিনি বিএসটিআই থেকে অনুমোদন নিয়েই কারখানায় লাচ্ছা উৎপাদন করছেন।
শেখাহার বাজারের বেশির ভাগ কারখানার অবস্থা একই রকম। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদনের পাশাপাশি সেমাই তৈরিতে অহরহ ব্যবহার করা হচ্ছে পোড়া তেল, মবিল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক রঙের মতো উপাদান। এসব মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হলেও তাতে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।
একই চিত্র বগুড়া শহরের আটাপাড়ার ইসলামিয়া লাচ্ছা সেমাই কারখানা, বৃন্দাবন পাড়ার জেমি লাচ্ছা সেমাই কারখানাসহ অধিকাংশ সেমাই কারখানার। বগুড়া শহরের উপকণ্ঠ বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শেওলাগাতি, কালিসামাটি, শ্যামবাড়িয়াসহ আশপাশে গড়ে উঠেছে ‘চিকন সেমাইপল্লি’। সেসব কারখানায়ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই তৈরি করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি রমজান মাসে এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১০টি লাচ্ছা সেমাই কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেছেন। বেশির ভাগ কারখানায় পায়ে মাড়িয়ে ময়দার খামির করার প্রমাণ মিলেছে। এ পর্যন্ত চার থেকে পাঁচটি কারখানার মালিককে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া জেলা কার্যালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে সেমাই উৎপাদন, পোড়া তেল ব্যবহার এবং অনুমোদনহীন রং ব্যবহারের দায়ে বগুড়া শহরের আটাপাড়ার ইসলামিয়া লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে এক লাখ টাকা এবং বৃন্দাবনপাড়ার জেমি লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।