১০ থেকে ১২ সন্ত্রাসী ঘিরে ধরে, পালাতে গেলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা
রাত তখন তিনটা বাজে। বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরের নানাবাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানসহ হেঁটেই বাড়ি ফিরছিলেন কাউসারুজ্জামান (৩৬)। নানার ঘর থেকে ২০০ মিটার দূরে এলে রাতের আঁধারে তাঁদের দুজনকে ঘিরে ধরে ১০ থেকে ১২ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। এরপর কাউসারুজ্জামান ও আশরাফুর রহমান পালানোর চেষ্টা করেন। দৌড়ে কিছুদূর যান তাঁরা। তখন পেছন থেকে কাউসারুজ্জামানকে লক্ষ্য করে গুলি করে একজন। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলির শব্দ ও মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানের চিৎকার শুনে এলাকার লোকজন বেরিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে স্বজনেরা কাউসারুজ্জামানকে হাসপাতালে নিলেও বাঁচাতে পারেননি। ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আলিখিলে এভাবেই পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির সমর্থক ও প্রবাসী কাউসারুজ্জামানকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে দেশে ফিরে আসেন দুই কন্যাসন্তানের জনক কাউসারুজ্জামান।
নিহত কাউসারুজ্জামানের স্বজন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত তথ্য দিতেন কাউসারুজ্জামান। পাশাপাশি এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রতিবাদী ভূমিকা ছিল তাঁর। এর জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময় থেকে র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনকে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিতেন তিনি। যা পরে জেনে যায় সন্ত্রাসীরা।
পাহাড় ও টিলায় ঘেরা পূর্ব আলিখিল গ্রাম উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরে। আজ রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের পথে পুলিশ টহল দিচ্ছে। গ্রামের পূর্ব পাশে কাউসারুজ্জামানের বাড়ি। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে গতকাল শনিবার তাঁকে দাফন করা হয়। বাড়িটিতে এখনো শোকার্ত মানুষের ঢল। বাড়ির উঠানে বসে ছিলেন কাউসারুজ্জামানের বাবা আবুল কালাম। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ আগে কয়েকজন সন্ত্রাসী এলাকার এক লোকের মুঠোফোন কেড়ে নেয়। ওই লোকের কাছ থেকে টাকাও নিয়ে যায় তারা। ওই দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন কাউসারুজ্জামান। বিষয়টি সন্ত্রাসীরা ভালোভাবে নেয়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ ঘটনার যোগ থাকতে পারে বলে আবুল কালাম মনে করেন।
পাশাপাশি এলাকার কিছু লোকজনের সঙ্গে মাটি কাটা নিয়েও দ্বন্দ্ব চলছিল কাউসারুজ্জামানের। কাউসারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বড় কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না বলে পুলিশও জানায়। গত বছর একটি পারিবারিক মারামারির ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশের ধারণা, তথ্য দেওয়ায় সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
গতকার রাতে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে নিহত কাউসারুজ্জামানের বাবা আবুল কালাম থানায় মামলা করেছেন বলে পুলিশ জানায়। এরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন পূর্ব রাউজান এলাকার বাসিন্দা মো. শফি (৩৯) ও মো. সুমন (৩৩)।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, কাউসারুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের দুই আসামিকে গতকাল রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সন্ত্রাসীদের হাতে মোট পাঁচজন খুন হন। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমের খামারবাড়ির কর্মচারী মুহাম্মদ ইউসুফ (৫০), কাউখালীর শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নান (৪৫), যুবদলের কর্মী আলমগীর আলম (৪৫) ও মুহাম্মদ সাইফুল (৩০)। সর্বশেষ সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারালেন কাউসারুজ্জামান।
নিহত কাউসারুজ্জামানের বড় ভাই পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আওয়ামী লীগের পতন দেখে বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর এখানে খেত–খামার করে চলতেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমের তথ্য দিতেন। মূলকথা, সন্ত্রাস প্রতিরোধে ভূমিকা ছিল তাঁর। এ জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এলাকার একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভিডিও করেছিলেন নিজের মুঠোফোনে। সেটির খবর পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর ক্ষেপে যায়। এসব কারণে তাঁকে কয়েকবার হুমকি দেয় এলাকার সন্ত্রাসীরা। সবশেষে মেরেই ফেলল। আমরা সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাউজানে ২০ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, আবার কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ২২ জন খুন হওয়া ছাড়া শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত ২২ জনের মধ্যে অন্তত ১৬ জন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি–বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি ও হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কাউসারুজ্জামানকে মূলত সন্ত্রাসীরা লক্ষ্যবস্তু করেছে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতেন বলে। প্রাথমিক তদন্তেও এটি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে রাউজানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুক্রবার রাতে কাউসারুজ্জামানকে খুনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।