বৃত্তির টাকায় কেনা গরু চুরি, থামছে না রুমানাদের কান্না

দিনমজুর আনিসুর রহমান ও আয়শা বেগম দম্পতির ১০ শতক ভিটেমাটি ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। তাঁদের চার মেয়ে, ছেলে নেই। মেধাবী মেয়েরাই তাঁদের সম্পদ না থাকার দুঃখ দূর করার চেষ্টা করেছিলেন।

দরিদ্র পরিবারটির মেধাবী দুই বোন বৃত্তির টাকা জমিয়ে বাবাকে চারটি গরু কিনে দিয়েছিলেন। অভাবের সংসারে গরুগুলো কিছুটা সচ্ছলতা নিয়ে আসবে, এমন স্বপ্নই ছিল তাঁদের। এক রাতেই তাঁদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে গোয়ালঘরের দরজায় লাগানো শিকল কেটে গরু চারটি চুরি করে নিয়ে গেছে চোর।
একসঙ্গে চারটি গরু হারিয়ে এখন দিশেহারা দিনমজুর আনিসুর রহমানের পরিবার। স্ত্রী-সন্তানদের কান্না থামাতে পারছেন না। নিজেও ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন।

ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের ঘটবর গ্রামে। দিনমজুর আনিসুর রহমান ও আয়শা বেগম দম্পতির ১০ শতক ভিটেমাটি ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। তাঁদের চার মেয়ে, ছেলে নেই। মেধাবী মেয়েরাই তাঁদের সম্পদ না থাকার দুঃখ দূর করার চেষ্টা করেছিলেন।


মেয়েদের মধ্যে সবার বড় আফসানা খাতুন ইংরেজি বিষয়ে অনার্স পাস করেছেন। দ্বিতীয় মেয়ে রুমানা আক্তার রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তৃতীয় মেয়ে লাবনী আক্তার রংপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএইচটি) রেডিওলজি বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। সবচেয়ে ছোট রিপা আক্তার পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে গোয়ালঘর থেকে চারটি গরু চুরি হয়ে যায়।
ছবি: প্রথম আলো

প্রায় তিন বছর আগে বড় দুই মেয়ে আফসানা ও রুমানা দুটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে পাওয়া শিক্ষাবৃত্তির টাকা দিয়ে চারটি ছোট গরু কিনে দিয়েছিলেন বাবাকে। প্রায় দুই মাস আগে হালের দুটি গরু বিক্রি করে আফসানার বিয়ে দেন আনিসুর রহমান।
পরিবারটির আর্থিক সব পরিকল্পনা ছিল গরুগুলো ঘিরে। রুমানা শিক্ষার্থী পড়িয়ে নিজের লেখাপড়া চালান। সংসারের নানা অভাবের কথা চিন্তা করে বাবাকে গরুগুলোর যত্ন নিতে বলেছিলেন রুমানা।


গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, আনিসুর রহমান একসময় নিজের মূলধন দুটি গরু দিয়ে অন্যের জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এরপর যান্ত্রিক হালের কারণে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর হাল বিক্রি। উপায়ান্তর না পেয়ে তিনি নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে অন্যের দুই বিঘা জমি বন্ধক (চুক্তি) নিয়ে সেগুলো চাষ করে সংসার চালাচ্ছেন।
বড় মেয়ে আফসানা খাতুন এইচএসসি পাসের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে মাসে তিন হাজার টাকা ও মেজ মেয়ে রুমানা আক্তার এসএসসি পাসের পর ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক থেকে মাসে দুই হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি পেতেন। সেই টাকার সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনের টাকা যোগ করে বাবাকে চারটি গরু কিনে দেন তাঁরা।

আনিসুর রহমানের স্বপ্ন ছিল, গরুগুলো বিক্রি করে মেয়েদের পড়াশোনা ও বিয়ের খরচ জোগাড় করবেন। কিন্তু চোর তাঁর স্বপ্নগুলো ভেঙে দিয়েছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি এখন দুশ্চিন্তায়।


রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের ছাত্রী রুমানা আক্তার বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ছুটির কারণে আমরা সবাই এখন বাড়িতে। কলেজ বন্ধ থাকায় প্রাইভেট টিউশনও চালাতে পারছি না। বাবা দীর্ঘদিন হাল বিক্রি করায় এখন পিঠের ব্যথায় ভুগছেন। এমনিতেই আমাদের চলতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। তারপরও বাবা আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাদের বৃত্তির টাকায় কেনা গরুগুলো লালন-পালন করছিলেন।’


কথা বলার সময় চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল রুমানার। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘সামনে আমার পরীক্ষা। ১২ হাজার টাকা ফি দিতে হবে। সেই টাকা কোথায় পাব, ভেবে পাচ্ছি না। গরুগুলো আমাদের আপৎকালীন একটা শক্তি ছিল। এখন আমাদের সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমার মেয়েরা শিক্ষাবৃত্তির টাকা আর টিউশনির টাকা দিয়ে এই গরুগুলো কিনে দিয়েছিল। সেগুলো পালন করে এখন বড় করেছি। একটি বিদেশি গরুসহ মোট চারটি গরুর বাজারমূল্য হবে প্রায় দুই লাখ টাকা। আশা ছিল গরুগুলো বিক্রি করে মেয়েদের ফরম পূরণসহ বড় অঙ্কের লেখাপড়ার খরচ ও বিয়ের খরচ জোগাড় করব। কিন্তু আমার সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী করব?’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, আনিসুর রহমানের চার মেধাবী মেয়ে তাঁর অনেক বড় সম্পদ। তেমনি গরুগুলো ছিল তাঁর বিপদের সঙ্গী। এর বাইরে তাঁর আর কোনো সম্পদ নেই। পরিবারটির সম্বল গরু চারটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এলাকার মানুষ হতভম্ব হয়ে গেছে।
ইউপি সদস্য জানান, চুরির ঘটনাটি তাঁরা পুলিশকে জানিয়েছেন।


চোর ধরার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়ে পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, ওই পরিবারের চারটি গরু চুরির ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গরু চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত চক্রটিকে ধরার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।