উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলি, এক রোহিঙ্গা নিহত

কক্সবাজারের উখিয়ায় একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির
ফাইল ছবি

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-৮ ডব্লিউ) মিয়ানমারের দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় ছৈয়দ আলম (৬১) নামের এক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। তিনি ওই আশ্রয়শিবিরের ‘ই’ ব্লকের এ/৪২ নম্বর শেডের বাসিন্দা। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত চারটার দিকে আশ্রয়শিবিরের ‘ই’ ব্লকে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

আশ্রয়শিবিরের কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা জানান, আধিপত্য বিস্তার, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বশত্রুতার জের ধরে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গুলিতে তাইফুর (১২) নামের এক রোহিঙ্গা শিশু আহত হয়েছে। সে উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের ( ক্যাম্প-৫) ‘ডি’ ব্লকের বাসিন্দা নুরুল আমিনের ছেলে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দিবাগত রাতে মিয়ানমারের দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে ছৈয়দ আলম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। তাঁর পিঠের ডান পাশে গুলি লাগে। একটি গুলি বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ শিশু তাইফুরকে উদ্ধার করে প্রথমে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ জানায়, আজ শনিবার সকালে ছৈয়দ আলমের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। সন্ত্রাসীদের ধরতে আশ্রয়শিবিরে অভিযান চালাচ্ছেন এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে আরসার ২০-২৫ জন সদস্যের একটি দল এক রোহিঙ্গাকে অপহরণের জন্য বালুখালী আশ্রয়শিবিরের ‘ই’ ব্লকের একটি আস্থানায় অবস্থান নেয়। খবরটি জানতে পেরে আশ্রয়শিবিরে থাকা আরএসওর সন্ত্রাসীরা মাঠে নামে। তখন দুই গোষ্ঠীর মধ্যে থেমে থেমে প্রায় আধা ঘণ্টা গোলাগুলি ও সংঘর্ষ চলে। এ সময় আতঙ্কে রোহিঙ্গারা দিগ্‌বিদিক ছুটতে থাকে। এ সময় ছৈয়দ আলম ও এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। খবর পেয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতা জানান, গত ২১ মার্চ দুপুরে উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের ( ক্যাম্প-১৩) ‘জি’ ৪ ব্লকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ও গুলিতে দুই রোহিঙ্গা নিহত হন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ওই আশ্রয়শিবিরের ‘জি’ ৪ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক (৩০) ও রফিক উল্লাহ (৩৪)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার অভিযোগে তাঁদের গুলি করে হত্যা করে আরসার সন্ত্রাসীরা। ১৮ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে উখিয়ার তাজনিমারখোলা আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৯) ‘ডি’ ব্লকে আরসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন হাফেজ মাহবুব (২৭) নামের আরেক রোহিঙ্গা।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে উখিয়ার কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে ১০টি পৃথক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ১১ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছে এক শিশুসহ চার রোহিঙ্গা।

গত পাঁচ মাসে আশ্রয়শিবিরে একাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ৩৬ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন রোহিঙ্গা মাঝি, ৮ জন আরসার সদস্য, ১ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যরা সাধারণ রোহিঙ্গা।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে আশ্রয়শিবিরে একাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ৩৬ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন রোহিঙ্গা মাঝি, ৮ জন আরসার সদস্য, ১ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যরা সাধারণ রোহিঙ্গা।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অস্থিরতার জন্য আরসাসহ তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও সাতটি ডাকাত দল রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।

এ বিষয়ে আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ হারুন অর রশিদ বলেন, সন্ত্রাসীদের ধরতে আশ্রয়শিবিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছে। অনেকে ধরাও পড়ছেন। কিন্তু গোষ্ঠীর মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। হোতাদের অনেকে আশ্রয়শিবিরের বাইরে অবস্থান করছেন।