বাবার সঙ্গে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আইরিন
গতকাল বৃহস্পতিবারের রাতটা যেন কাটতেই চাইছিল না আইরিন সুলতানার। এই ঘুম আসছিল, এই ভেঙে যাচ্ছিল। ভোর পাঁচটার দিকেই বাবাকে তাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তোলে সে। এরপর শুরু প্রস্তুতি। বাবার সঙ্গে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সকাল আটটার দিকে নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে আসে শিখো–প্রথম আলোর জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায়।
আইরিন জানায়, বেলাব উপজেলার সররাবাদ এলাকা থেকে অটোরিকশা ও বাসে চেপে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসে। ইচ্ছা করলে আরেকটু পরে রওনা দিতে পারত। বাবা বারবার বোঝালেও মন মানছিল না। এসে দেখে আটটার দিকেও অনেক শিক্ষার্থী তার মতোই আগে আগে চলে এসেছে।
আইরিনের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরেই এ অনুষ্ঠান নিয়ে তাঁর মেয়ে খুব উচ্ছ্বসিত। অন্যদিন তাকে ডেকে তোলা লাগলেও আজ সকালে নিজে থেকেই ঘুম থেকে উঠেছে সে। নিজে প্রস্তুত হয়ে তাঁকেও প্রস্তুত করেছে।
শুধু আইরিন সুলতানাই নয়, তার মতো ৩০–৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মনোহরদীর রামপুর থেকে জান্নাতি আক্তার ও রায়পুরার দুর্গম চরাঞ্চল বাঁশগাড়ী থেকে সাবিনা আক্তারও অনুষ্ঠানে আসে। জানাল, এ সংবর্ধনা ছিল তাদের জন্য স্বপ্নের ও উচ্ছ্বাসের।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আজ শুক্রবার সকালে নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে ওই অনুষ্ঠান হয়।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সকাল ১০টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। নরসিংদী বন্ধুসভার সভাপতি মাইনুল রহমান খান ও সহসভাপতি সায়মা বিথির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি প্রণব কুমার দেবনাথ।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক ইমন হোসেন বলেন, ‘তোমরা এমন করে তৈরি হও, যাতে ভবিষ্যতে তোমাদের জ্ঞান ও মেধা পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাজে আসে।’
১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য আমাদের যে প্রজন্ম গড়ে তোলা দরকার, প্রথম আলো তাদের অবস্থান থেকে সে দায়িত্বটা পালন করে যাচ্ছে।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নরসিংদী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘তোমাদের মাধ্যমেই আগামী দিনের বাংলাদেশ বদলে যাক, এই আশা আমরা করি।’ প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজার আনোয়ারুল কবির বলেন, ভালো ফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা, নির্মোহ মানুষ হয়ে ওঠা, মানবিক ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি।
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ‘প্রথম আলো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে তরুণেরাই। যেকোনো পরিবর্তন তরুণেরাই করে, ইতিহাস তা–ই বলে। তরুণেরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। সে জন্য পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও ভালো বই পড়তে হবে, ভালো গান শুনতে হবে, সংবাদপত্র পাঠ করতে হবে, সংস্কৃতিজগতের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।’
প্রথম আলো নরসিংদী বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ নরসিংদীর সাধারণ সম্পাদক মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শিক্ষার্থীদের শপথ পড়ান। আর ড্রিম হলিডে পার্কের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম (সবুজ) কৃতী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান।
আলোচনা অনুষ্ঠান, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণী পর্বের মধ্যে কখনো সংগীত, কখনো নৃত্য, কখনো আবৃত্তিতে মুখর ছিল মঞ্চ। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ও আবৃত্তিকার জহির মৃধা। গান গেয়ে শোনান অকৃতা সাহা, তনুশ্রী চক্রবর্তী, সুষ্মিতা সাহা, শুভ্রনীল বসু ও এহসানুল হক। নৃত্য পরিবেশন করেন রুবেয়া আক্তার ও ফাতিমা জান্নান হুমাশা।