৪১৮ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজের লস্কর খানবাড়ি মসজিদ
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাঘড়া লস্কর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে মোগল আমলের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এলাকাবাসীর ধর্মীয় ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই মসজিদটি আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
মসজিদের গায়ের বিভিন্ন নিদর্শন দেখে ধারণা করা হয়, মোগল আমলে বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময়কালে এটি নির্মিত হয়। স্থানীয় ইতিহাস–ঐতিহ্য অনুসন্ধানকারীরা মনে করেন, আজিমোল্লাহ খান মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গ্রামটির নাম অনুসারেই এটি ঘাঘড়া লস্কর খানবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিতি পায়।
এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০ ফুট। মাঝের বড় গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে ছোট–বড় ১০টি মিনার। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটি জানালা এবং পূর্ব দিকে একটি প্রবেশদ্বার আছে। ভেতরে দুটি খিলান, মেহরাব এবং দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন রঙের ফুল ও ফুলদানির নকশা করা কারুকাজ দেখা যায়। চার ফুট পুরু দেয়াল চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
মসজিদের ভেতরে তিন কাতারে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলা বারান্দা ও চত্বরে আরও প্রায় ১০০ জনের নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। মোট ৫৮ শতাংশ জমির ওপর মসজিদটি অবস্থিত—এর মধ্যে ১৭ শতাংশ জায়গায় মূল ভবন ও বারান্দা এবং বাকি ৪১ শতাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে কবরস্থান।
স্থাপত্যশৈলীতে গ্রিক ও কোরিনথিয়ান রীতির প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা এটিকে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় এবং এটি তাদের তালিকাভুক্ত একটি পুরাকীর্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শেরপুর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সবুজে ঘেরা ঘাঘড়া গ্রাম। কয়েরুট সড়ক থেকে পশ্চিমে প্রায় ২ কিলোমিটার মেঠো পথ পাড়ি দিলেই সবুজ ঘাসের মাঠের মধ্যে মোগল আমলের নির্মিত এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি চোখে পড়ে। পাশে রয়েছে দুটি পুকুর। মসজিদের ভেতর সাদা রঙে একাকার করে রাখা হয়েছে, ফলে আগের কারুকাজ তেমন চোখে পড়ে না। তিন কাতারে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। বাইরে বেদিতে খোলা আকাশের নিচেও নামাজ আদায় করা হয়।
এলাকার শিক্ষক ও ছড়াকার শাহিনুর শিমুল বলেন, মসজিদটি ১৬০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বলে ধারণা করা হয়। মোগল আমলে বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময় এটি নির্মিত হয়েছে বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তিনি আরও বলেন, মসজিদটি এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে প্রতিদিন এখানে দর্শনার্থীরা আসেন। অনেকে নামাজ আদায়ও করেন। তবে অনেক বছর পুরোনো হলেও সংরক্ষণ ও সংস্কারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি জেলার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. ফেরদৌস খান বলেন, ‘প্রায় ৫০০ বছর আগে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। বংশপরম্পরায় দাদার পর বাবা, এখন আমি দায়িত্বে আছি। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়। ইমাম ও মুয়াজ্জিন আছেন।’ তিনি আরও বলেন, মসজিদের নামে দুটি পুকুর আছে। এর আয় দিয়ে বিভিন্ন খরচ বহন করা হয়। দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ মোগল আমলের এই মসজিদ একনজর দেখতে ছুটে আসেন। আগে ভেতরের কারুকাজে আলাদা আলাদা রং ছিল। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে সাদা রং করে দেওয়ায় আগের সৌন্দর্য আর দেখা যায় না বলে তিনি জানান।