চায়না দুয়ারীর ব্যবহার বাড়ায় উপজেলার ছোট-বড় ৩০০ বিলের মধ্যে অন্তত ৮০টির অবস্থা ধীরেন বাবুর বিলের মতো। খাল ও নদীগুলোর চিত্র অনেকটা একই রকম। এ বিষয়ে কয়েকজন জেলে বলেন, কয়েক বছর ধরে জলাশয়গুলোতে দেশি মাছ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ চায়না দুয়ারী। এটি যেকোনো মাছের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখছেন মৎস্যজীবী ও মৎস্য কর্মকর্তারা।

চায়না দুয়ারী নামের মাছের ফাঁদ অনুসন্ধানে সম্প্রতি এ প্রতিবেদক সরেজমিনে যান শ্রীপুরের শালদহ, পবা, মাইছা গাঙ ও দোখলা, চোক্ষা, আম্বরিয়া, হাসিখালি, চেঙ্গির খাল, সুইততার খালসহ কয়েকটি খাল, বিল ও নদীতে। দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি জলাশয়ে মাছের খরা। এরপরও অনেক জায়গায় পেতে রাখা হয়েছে চায়না দুয়ারী ফাঁদ।

মাওনা ইউনিয়নের সিরিশগুড়ি ও বদনিভাঙ্গা গ্রাম হয়ে চলে যাওয়া শালদহ নদীতে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচে অন্তত দেড় শ ফুট দৈর্ঘ্যের এক ধরনের মাছ ধরার ফাঁদ ডাঙায় তুলে আনছেন এক জেলে। ওই জেলে জানালেন, এটি চায়না দুয়ারী। অত্যন্ত মিহি ছিদ্রযুক্ত বিশেষ ধরনের এই ফাঁদে আটকা পড়েছে সবচেয়ে ছোট মাছটিও। মাছের সঙ্গে উঠে এসেছে জলজ পরিবেশের জন্য উপকারী বিভিন্ন কীটপতঙ্গ। ফাঁদ থেকে মাছ ছাড়ানোর সময় কীটপতঙ্গগুলো মারা পড়ে। সেই সঙ্গে মারা যায় অপ্রয়োজনীয় কিছু মাছ। এই ফাঁদে দেশি টেংরা, পুঁটি, চেলাসহ বিভিন্ন মাছের পোনা আটকা পড়তে দেখা গেছে।

চায়না দুয়ারী এমনভাবে বানানো যে এটি খাল, নদী বা বিলের বিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপন করা যায়। ছোট-বড় যে আকৃতির মাছই হোক, এ ফাঁদে একবার ঢুকলে ধরা পড়বেই। চারকোনা আকৃতির লোহার ফ্রেম একটার সঙ্গে আরেকটা যুক্ত করে তাতে জড়িয়ে দেওয়া হয় খুবই সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত জাল। এক পাশে কিছু অংশ খোলা থাকে। এই অংশ দিয়ে মাছ ফাঁদে প্রবেশ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চায়না দুয়ারীগুলো জলাশয়ের তলদেশে স্থাপন করা হয়। ফলে এসব জাল সহজে চোখে পড়ে না।

২৫ বছর ধরে মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত জোবেদ আলী চায়না দুয়ারী জালে মাছের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রথম আলোকে জানান। তাঁর মতে, এটি নিখুঁতভাবে সব পোনা মাছ পর্যন্ত ধরে ফেলে। ফলে টেংরা, কই, মলা, চাপিলা, বাইম, গুতুম, চিংড়ি, শিং, মাগুর, টাকিসহ সব ধরনের মাছের বংশবৃদ্ধি কমে যায়। তাঁর মতে, অত্যন্ত মিহি ছিদ্রযুক্ত এ ফাঁদে মাছের ডিম পর্যন্ত আটকে যায়।

ভেরামতলী গ্রামের মাছশিকারি মো. আলম নামের এক মৎস্যজীবী বলেন, পাঁচ-সাত বছর আগে নৌকা নিয়ে বের হলে পাঁচ-ছয়জন জেলে মাছ ধরে রোজ এক হাজার টাকার ওপর পেতেন। এখন ২০০ টাকাও পড়ে না। পরিশ্রম করে এখন আর পোষায় না। অবৈধ চায়না দুয়ারীর কারণে দেশি মাছের বারোটা বেজে গেছে। এখানে কেউ কিছুই বলছে না।

চায়না দুয়ারী এখন মাছের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানালেন শ্রীপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওয়াহেদুল আবরার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এ ফাঁদ ব্যবহার অবৈধ। আমরা বিভিন্ন বিল, নদী–নালায় প্রায়ই অভিযান চালাই। ফাঁদ জব্দ করি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করার ব্যবস্থা নেব।’

নামে চায়না দুয়ারী হলেও মাছ ধরার এ ফাঁদ দেশে তৈরি হয় বলে জানালেন মৎস্যজীবীরা। তাঁদের ভাষ্য, অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারী ধ্বংস করলে হবে না। এগুলোর উৎপাদনকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। চায়না দুয়ারী চীন থেকে আসে না। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এসব ফাঁদ উৎপাদনের কারখানা আছে। এসব বন্ধ করা দরকার।

বদনিভাঙ্গা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মাছ ব্যবসায়ী মিয়ার উদ্দিন বলেন, তিনি ভেরামতলীর বিভিন্ন বিল ও শালদহ নদীর আশপাশে জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে পাশের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। মিয়ার উদ্দিন বলেন, ৫ বছর আগে এসব স্থানে জেলেদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০-৬০ কেজি দেশি মাছ কেনা যেত। কিন্তু বর্তমানে ১০–১২ কেজি মাছও কেনা যায় না। তিনি বলেন, মাছ কমে যাওয়ার এই পরিস্থিতি শ্রীপুরের সব জায়গায়। তবে বিভিন্ন প্রজেক্ট থেকে চাষ করা মাছ পাওয়া যাচ্ছে। চাষের মাছের পরিমাণ বেড়েছে।