নিজের টাকায় কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগিয়ে চলেছেন ‘ছমির স্যার’

কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ করছেন আতিকুল হক। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার আজগরিয়া আদর্শ দাখিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেছবি: সংগৃহীত

পাঁচ বছর আগে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন আতিকুল হক ওরফে ছমির স্যার। তবে অবসর মানেই অলস জীবন, এমনটা মানতে নারাজ তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থে কৃষ্ণচূড়ার চারা কিনে ছুটে চলেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কখনো বিদ্যালয়ের মাঠে, কখনো হাসপাতাল প্রাঙ্গণে, আবার কখনো মসজিদ–মন্দির–ঈদগাহ কিংবা শ্মশানঘাটে—নিজ হাতে রোপণ করছেন গাছের চারা।

ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ করেছেন এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর রোপণ করা গাছ এখন দেখা যাচ্ছে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। সখীপুরের ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা ছাড়াও কালিহাতীর পারখী ও নাগবাড়ী, ঘাটাইলের সাগরদীঘি ও ধলাপাড়া ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কয়েকটি এলাকাতেও তিনি চারা লাগিয়েছেন।

আতিকুল হক সখীপুর উপজেলার বড়চওনা গ্রামের বাসিন্দা। ২০২১ সালে বড়চওনা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন তিনি। অবসরের পর সময় কাটানোর জন্য বসে না থেকে মানুষ ও প্রকৃতির জন্য কিছু করার চিন্তা থেকেই শুরু করেন বৃক্ষরোপণের কাজ।

একদিন কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো বড় হবে। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে। সেই ছায়ায় বসবে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। হয়তো সেদিন আমি থাকব না। কিন্তু গাছগুলো থেকে যাবে।
আতিকুল হক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

অবসর মানেই অলস জীবন নয়

নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন জানিয়ে আতিকুল হক বলেন, ‘কর্মজীবনে আমি শিক্ষক ছিলাম। এখন অবসর নিয়েছি। কিন্তু অবসর মানেই কর্মহীন বা অলস জীবন, এটা আমি মনে করি না। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে সবুজ, শীতল ও মনোরম করে তুলতেই কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি চারা রোপণ করেছি। ভবিষ্যতেও এ কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

নিজের হাতে লাগানো গাছ একদিন বড় হয়ে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে—এই স্বপ্নই ছমির স্যারকে কাজটি করে যেতে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষ ও সমাজের মঙ্গলের জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে সার্থক মানুষ মনে করব। যেদিন দেখব, আমার লাগানো কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো বড় হয়েছে, গাঢ় সবুজ পাতার ডগায় হাজারো লাল ফুল ফুটেছে, আর সেই গাছের ছায়ায় শিক্ষার্থী ও মানুষ বসে স্বস্তি পাচ্ছে—সেদিন নিজেকে সফল মনে করব।’

বৃক্ষরোপণের এ উদ্যোগে শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছে। বড়চওনা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফসারা সাফিয়া সাউদা বলে, ‘ছমির স্যারের উদ্যোগ আমাকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেছে। আমাদের স্কুলের আঙিনায় স্যারের লাগানো গাছটি যখন বড় হবে, তখন অনেক মানুষ ছায়া পাবে। পরিবেশও সুন্দর হবে।’

কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ করছেন আতিকুল হক। তাঁকে সহযোগিতা করছেন কলেজের অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন। টাঙ্গাইলের সখীপুর সরকারি কলেজ চত্বরে
ছবি: প্রথম আলো

নিজ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ একটি মানবিক কাজ মন্তব্য করে মহানন্দপুর বিজয় স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘এমন উদ্যোগের জন্য ছমির স্যারকে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাই।’

সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলমও এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, অবসরজীবনে থেকেও আতিকুল হকের নিজের অর্থ ও শ্রম দিয়ে বৃক্ষরোপণের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয় ও অনুসরণীয়।

গড়ে তুলেছেন পাঠাগার

শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, লেখালেখি ও বই পড়ার প্রতিও ছমির স্যারের আগ্রহ রয়েছে। ২০০৮ সালে তাঁর লেখা ‘শ্যামলিমা’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বাড়িতে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত পাঠাগার। সেখানে রয়েছে প্রায় এক হাজার বই।

খেলাধুলার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ফুটবল, ভলিবল ও কাবাডিতে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে আসছেন। ১৯৯৫ সালে বড়চওনা-কুতুবপুর ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় সাংগঠনিক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

‘আমি থাকব না, কিন্তু গাছগুলো থেকে যাবে’

আতিকুল হকের কাছে বৃক্ষরোপণ কোনো প্রচারণার বিষয় নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। তিনি বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে চারা লাগানোর সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের উৎসাহ তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই, আমার লাগানো গাছগুলো দেখে আরও মানুষ গাছ লাগাতে উৎসাহিত হোক। তখনই মনে হবে, আমার এই ছোট্ট উদ্যোগ সার্থক হয়েছে।’

আতিকুল হকের স্বপ্ন, ‘একদিন কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো বড় হবে। ফুলে ফুলে ভরে উঠবে। সেই ছায়ায় বসবে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। হয়তো সেদিন আমি থাকব না। কিন্তু গাছগুলো থেকে যাবে।’